কিউবায় তীব্র জ্বালানি সংকটে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর জ্বালানি অবরোধের কারণে কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়ায় সমগ্র দেশ এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বীপরাষ্ট্রটিকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
ট্রাম্পের দম্ভোক্তি ও কিউবার 'দুর্বল' অবস্থা
সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কিউবাকে একটি 'অত্যন্ত দুর্বল দেশ' হিসেবে অভিহিত করেন এবং দেশটিকে মুক্ত করা বা নিজের আয়ত্তে নেওয়ার সুযোগ পাবেন বলে দম্ভোক্তি করেন। তার এই বক্তব্য লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিকবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেও অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি অবরোধের প্রভাব ও বিদ্যুৎ সংকট
ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া জ্বালানি অবরোধের কারণে গত ৯ জানুয়ারির পর কিউবায় কোনো তেলের চালান পৌঁছায়নি, যা ১০ মিলিয়ন মানুষের দেশটিকে এক নজিরবিহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিউবার সরকারি বিদ্যুৎ সংস্থা ইউনিয়ন নাসিওনাল ইলেকট্রিকা (ইউএনই) নিশ্চিত করেছে যে জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়ায় রাজধানী হাভানাসহ দেশের বড় অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতির তদন্ত শুরু করলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ পায়নি; মূলত জ্বালানি তেলের অভাবেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কোনোমতে মাত্র ৫ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে যেকোনো সময় এই ক্ষুদ্র সার্কিটগুলোও আবারও বিকল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত চার মাসে তৃতীয় বৃহত্তম ব্লাকআউট
গত চার মাসে কিউবায় এটি তৃতীয় বৃহত্তম ব্লাকআউটের ঘটনা, যা দেশটির অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও বাহ্যিক চাপের সম্মিলিত প্রভাবকে উন্মোচিত করছে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে কিউবার কমিউনিস্ট শাসিত সরকারের পরিবর্তন চাইছে এবং এজন্য দেশটির ওপর কঠোর জ্বালানি অবরোধ আরোপ করেছে। গত জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কিউবার কাছে তেল বিক্রি বা সরবরাহকারী যে কোনো দেশের ওপর মার্কিন ট্যারিফ আরোপ করা হবে।
খাদ্য ও ওষুধের অভাবসহ মানবেতর পরিস্থিতি
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে কিউবায় মাত্র দুটি ক্ষুদ্র তেলের জাহাজ ভিড়তে সক্ষম হয়েছে। এই অবরোধের ফলে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে কেবল বিদ্যুৎ সংকটই নয়, বরং খাদ্য ও ওষুধেরও তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। মানবেতর পরিস্থিতির কারণে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে এবং সম্প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির একটি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের মতো বিরল বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।
বিদ্যুৎহীন অবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ৬১ বছর বয়সী হাভানা নিবাসী তমাস ডেভিড জানান, 'বাড়িতে থাকা সামান্য খাবারও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং এমন পরিস্থিতিতে মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে।' তার এই বক্তব্য কিউবার সাধারণ নাগরিকদের দুর্দশার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোপন আলোচনা ও কিউবার বিনিয়োগ আহ্বান
যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়াশিংটন বর্তমানে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেলের ক্ষমতা ত্যাগ নিয়ে আলোচনা করছে, যদিও তার পরিবর্তে কাকে ক্ষমতায় দেখতে চায় সে বিষয়ে কিছু স্পষ্ট করেনি। এদিকে কিউবা সরকার বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশে বসবাসরত কিউবান ও প্রবাসীদের দ্বীপে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
উপ-প্রধানমন্ত্রী অস্কার পেরেজ-অলিভা ফ্রাগা সোমবার ঘোষণা করেছেন, প্রবাসীরা এখন কিউবায় ব্যবসা ও বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্বের পাশাপাশি তাদের জন্য বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধাও দেওয়া হবে। কিউবা সরকার যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে প্রবাসীদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, তখন ট্রাম্পের 'দখল' করার হুমকি ও অনড় অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
