মার্কিন প্রেসিডেন্টের কঠোর বক্তব্য: ন্যাটো মিত্রদের প্রতি হুঁশিয়ারি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের তীব্র আবহে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে এবং চলমান সামরিক অভিযানে মিত্ররা যদি যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ন্যাটোর সামনে 'খুবই খারাপ ভবিষ্যৎ' অপেক্ষা করছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
ন্যাটোর কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা
ট্রাম্প ন্যাটোর কার্যক্রমকে একটি 'একমুখী রাস্তা' হিসেবে অভিহিত করে অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মিত্রদের পাশে দাঁড়ালেও প্রয়োজনের সময় মিত্ররা তাদের সঙ্গ দিচ্ছে না। তিনি তার বক্তব্যে বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে মিত্রদের সমালোচনা করেন। ট্রাম্প বলেন, 'ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে হাজার মাইল দূরে হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকানরা উদারভাবে সেখানে সহায়তা পাঠিয়েছে, যা আসলে তাদের করার প্রয়োজন ছিল না।' এখন ইরানের বিপদজনক সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের এই লড়াইয়ে মিত্ররা একই রকম সহযোগিতা করবে কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
মিত্রদের কাছ থেকে কী চান ট্রাম্প?
মিত্রদের কাছ থেকে ঠিক কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, 'যা কিছু প্রয়োজন' তার সবই দিতে হবে এবং এখানে কোনো শর্ত চলবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই যুদ্ধে সাফল্য অর্জনের জন্য পূর্ণাঙ্গ সমর্থন অপরিহার্য। ট্রাম্পের দাবি হলো:
- হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে অবিলম্বে সহায়তা
- ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসে কৌশলগত সমর্থন
- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণ
যুক্তরাজ্যের ওপর তীব্র ক্ষোভ
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্যের ওপরও তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, যুক্তরাজ্যকে এক নম্বর মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও যখন তাদের এই যুদ্ধে আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল, তখন তারা আসতে চায়নি। ট্রাম্পের ভাষায়, 'মার্কিন বাহিনী যখন ইরানের সক্ষমতা প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে, তখন ব্রিটেন দুটি জাহাজ পাঠানোর কথা বলেছে।' এই বিলম্বিত প্রস্তাবকে উপহাস করে ট্রাম্প বলেন যে, তার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল যুদ্ধের ময়দানে জেতার আগে, জেতার পরে নয়। মিত্রদের এমন গড়িমসি ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে বলে তিনি মনে করেন।
চীনের ওপর চাপ সৃষ্টির নতুন কৌশল
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির নতুন কৌশলের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত সম্মেলনটি পিছিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। ট্রাম্পের যুক্তি হলো, চীন ও অন্যান্য দেশ যেহেতু এই জলপথের বড় সুবিধাভোগী, তাই এই পথ নিরাপদ রাখার দায়িত্ব তাদেরও নিতে হবে। তিনি মনে করেন, 'যারা এই প্রণালীর সুফল ভোগ করছে, সেখানে কোনো অঘটন না ঘটা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব তাদেরই হওয়া উচিত।'
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত
ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন অস্থিরতা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বক্তব্য ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি শুধু ন্যাটো নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিন্যাসেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মিত্র দেশগুলো এখন তাদের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
