রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশি তরুণদের মর্মান্তিক পরিণতি
চাকরি ও স্থায়ী উন্নত জীবনের লোভে পড়ে রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার পর্যন্ত ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রয়েছে শতাধিক বাংলাদেশি তরুণ, যাদের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে তা এখনো অনিশ্চিত। ব্যাংককভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রুথ হাউন্ডস সম্প্রতি বাংলাদেশে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশি তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনের মূল তথ্য
গবেষণা রিপোর্টটি বাংলাদেশ এবং ইউক্রেনের ২৪ জনের সাক্ষাত্কারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং শ্রীলঙ্কা ও নেপালের যুদ্ধবন্দির সাক্ষাত্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইউক্রেনীয় তথ্যের ভিত্তিতে কমপক্ষে ১০৪ জন বাংলাদেশিকে এই যুদ্ধে নিয়োগ করা হয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে কমপক্ষে ৩৪ জন মারা গেছেন। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে এবং অনেকে সাক্ষাত্কারে ‘ডজন ডজন’ বাংলাদেশি নিহত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংখ্যাটি সম্ভবত একটি ন্যূনতম অনুমান এবং প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।’ ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘সাক্ষাত্কারে অনেক আত্মীয়স্বজন তাদেরকে জানিয়েছেন যে, তারা তাদের প্রিয়জনদের মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছেন। তারা এখনো তাদের মৃতদেহ গ্রহণ করতে পারেননি। তারা তাদের ছেলেদের লাশ দেশে এনে ধর্মীয় রীতিতে সঠিকভাবে দাফন করতে চান। তারা এখনো অপেক্ষা করছেন।’
দালালদের প্রতারণা ও নিয়োগের ধরন
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের নিয়োগের ধরন নিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অনেক পুরুষ দালালদের প্রতি ব্যক্তিকে ১,০০০ থেকে ৫,০০০ ডলারের মধ্যে অর্থ প্রদান করেছিলেন এই বিশ্বাস করে যে, তারা বিদেশে চাকরি পাচ্ছেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন তারা ইউরোপের কারখানায় কাজ করবেন। অন্যরা বিশ্বাস করেছিলেন যে, তারা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত নন-যুদ্ধ ভূমিকা গ্রহণ করবেন।’ গবেষকদের মতে, পুরুষরা রাশিয়ান ভাষায় লেখা নথিগুলো সম্পূর্ণরূপে পড়তে পারতেন না, তাদের অনুবাদক বা আইনি সহায়তা দেওয়া হয়নি এবং তারা যুদ্ধে নাম লেখাচ্ছেন যা সম্পূর্ণরূপে না বুঝেই স্বাক্ষর করা হয়েছিল।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা একজন বাংলাদেশি গবেষকদের জানিয়েছেন যে, তিনি তার দরিদ্র পরিবারকে টাকা পাঠানোর আশায় ‘সাইন আপ’ করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, তিনি একজন সহায়কের ভূমিকা পালন করবেন। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর, তাকে অধিকৃত ইউক্রেনে মোতায়েন করা হয়েছিল এবং সম্মুখ সারিতে পাঠানো হয়েছিল। যখন তিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, তখন মতবিরোধের পর কমান্ডাররা তাকে মারধর করেছিলেন। পরে ঐ তরুণ বাংলাদেশে ফিরে আসার পর ফোর্টিফাই রাইটস তার সাক্ষাত্কার নেয়। সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনে তার সঙ্গে থাকা অন্যরা ফিরে আসতে পারবেন না।’
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও সুপারিশ
ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের সহনির্বাহী পরিচালক ওকসানা পোকালচুক তার প্রতিবেদনে বলেছেন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভারত থেকেও অনেকে একইভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, যা এই সমস্যার আঞ্চলিক মাত্রা নির্দেশ করে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারকে নিম্নলিখিত সুপারিশ করা হয়েছে:
- বিদেশে শ্রমিক পাঠানো সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ
- পুলিশ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে পাচারবিরোধী সমন্বয় জোরদার
- দেশে ফিরে আসা বেঁচে যাওয়াদের জন্য আরও ভালো সহায়তা প্রদান
এই ঘটনা বাংলাদেশি তরুণদের বিদেশে চাকরির প্রত্যাশায় কীভাবে প্রতারণার শিকার হতে পারে তার একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধের চলমান পরিস্থিতিতে নিহত ও আটক বাংলাদেশিদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংকটের একটি নতুন দিক উন্মোচন করছে।
