পিট হেগসেথের বিতর্কিত দাবি: উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে?
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে মার্কিন ঘাঁটি এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করছে, যা তারা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, হামলা বন্ধ হলে তারা পাল্টা জবাব থামিয়ে দেবে। তবে এসব হামলার ফলে ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।
হেগসেথের মন্তব্য এবং প্রশ্নের জন্ম
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের চরম ইরান-বিরোধী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিট হেগসেথ ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সুবিধা কেবল বাড়ছে। এ ছাড়া আমাদের উপসাগরীয় মিত্ররা এখন আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে।’ তবে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি, যা হেগসেথের মন্তব্যকে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বাস্তবতা এবং মিথ্যা দাবি
হেগসেথের কিছু দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণস্বরূপ, তিনি একই সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ বা ট্যাংকার চলাচল করতে পারছে না। ইরান অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান এবং হামলা
যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ওপর হামলা না চালাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তদবির করেছিল, কারণ তাদের ভয় ছিল যে যুদ্ধ শুরু হলে তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইতিমধ্যে, কাতারের রাজধানী দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এবং বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ইরান হামলা চালিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে ইরান চাইলে এসব দেশে হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক প্রভাব
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া এক প্রস্তাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হয়, কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে ওই প্রস্তাবে কিছুই বলা হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরানের আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে যাওয়া এখন আর কোনো স্লোগান নয়; বরং বাস্তব।’
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এখন নিজেরা আক্রান্ত হওয়ায় তারা ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে, তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও নাখোশ। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারেনি।
জ্বালানি খাতের উপর প্রভাব
উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করা হয়, যা যুদ্ধ শুরুর পর ইরান প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এতে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। হামলার মুখে কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব জ্বালানি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১৬টি তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে।
পণ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যের বরাতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি খাতে আনুমানিক ১ হাজার ৫১০ কোটি ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাতার, বাহরাইন, আমিরাত ও কুয়েত।
হেগসেথের দাবির সম্ভাব্য ঝুঁকি
এ পরিস্থিতিতে হেগসেথের উল্লিখিত দাবি উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কারণ, ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে যারা এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সমর্থন দেবে, তাদের ওপর কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। হেগসেথের মন্তব্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে রয়েছে।
