মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর 'কোনো ছাড় নয়' মন্তব্যে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুদ্ধে ইরানকে 'কোনো ছাড় দেওয়া হবে না' এবং 'কোনো দয়া দেখানো হবে না'। গত শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, 'আমরা চাপ অব্যাহত রাখব, আঘাত হানব এবং সামনে এগিয়ে যাব'।
আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী মন্তব্য
হেগসেথের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধের নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হেগ কনভেনশনসহ বিভিন্ন চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে 'রেহাই না দেওয়ার' হুমকি বা আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক আইন ও ১৯৯৬ সালের 'ওয়ার ক্রাইমস অ্যাক্ট'-এও এই ধরনের নীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, 'হেগসেথের মন্তব্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। এটি সত্যি হতবাক করার মতো কথা'। তিনি আরও যোগ করেন, এসব আগ্রাসী ও বেআইনি মন্তব্যের প্রভাব যুদ্ধের ময়দানে পড়ছে কি না, সেটাই এখন আসল প্রশ্ন।
যুদ্ধে বেসামরিক হতাহতের উদ্বেগ
হেগসেথের মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর আন্তর্জাতিক নিয়মগুলোকে উপেক্ষা করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যেই ইরানে চলমান যুদ্ধে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৭০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই শিশু।
ব্রায়ান ফিনুকেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'আসল কথা হলো, যারা অস্ত্র সমর্পণ করেছে, তাদের হত্যা করা অমানবিক এবং এটি হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে'। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে শুধু 'কাউকে রেহাই না দেওয়ার' ঘোষণাই যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
অন্যান্য ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
ইরান যুদ্ধে ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা এ যুদ্ধকে কোনো উসকানি ছাড়াই একটি অবৈধ আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি সামরিক জাহাজ 'আইরিস ডেনা' ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় অন্তত ৮৪ জন নিহত হয়েছেন। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, সাগরে জাহাজডুবির শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও সহায়তা করা বাধ্যতামূলক, কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে মার্কিন বাহিনী উদ্ধারে এগিয়ে আসতে অস্বীকৃতি জানায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাহাজডুবির ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, হেগসেথ একে 'নিভৃত মৃত্যু' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দম্ভ করে বলেন, 'আমরা জেতার জন্যই লড়ছি'।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়াশিংটন ডিরেক্টর সারা ইয়াগার হেগসেথের ভাষাকে 'উদ্বেগজনক' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, '২০ বছর ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছি। কিন্তু এমন কথা শুনে আমি স্তব্ধ। শীর্ষ নেতাদের এমন কথা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি যুদ্ধের গতিপথ ঠিক করে দেয়'। তিনি আরও সতর্ক করেন, আইনি বিধিনিষেধকে তুচ্ছজ্ঞান করা নৃশংসতা ঠেকানোর দৃষ্টিকোণ থেকে এক বড় ধরনের বিপৎসংকেত।
বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে ধ্বংসলীলাকে প্রাধান্য দেওয়ার এই নীতি এখন ইরান যুদ্ধেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। হেগসেথের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
