রমজানের শেষ দশকে মুসল্লিশূন্য আল-আকসা: ইতিহাসের নির্মম অধ্যায়
রমজানের শেষ দশ দিন ফিলিস্তিনিদের জন্য ইবাদত ও ইতিকাফের পবিত্র সময় হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর এ সময় হাজার হাজার মুসল্লি আল-আকসা মসজিদে সমবেত হয়ে ধর্মীয় আচার পালন করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের রমজান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য উপস্থাপন করেছে। বিগত ৬৯ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম রমজানের শেষ দশকে আল-আকসা মসজিদ মুসল্লিশূন্য হয়ে পড়েছে, ইতিকাফ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি
১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দশ দিনে আল-আকসা মসজিদ ও জেরুজালেমের পুরনো শহরকে পুরোপুরি মুসল্লিশূন্য করে রেখেছে ইসরাইল। মসজিদের করিডোরগুলো এখন নিস্তব্ধ, নেই হকারদের হাঁকডাক কিংবা ইবাদতকারীদের চেনা ভিড়। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত যে আঙিনা মানুষের উপস্থিতিতে মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন নেমে এসেছে গভীর নীরবতা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধকে অজুহাত দেখিয়ে আল-আকসাকে কার্যত বন্দিশালায় পরিণত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের জন্য এক অবর্ণনীয় বঞ্চনার সৃষ্টি করেছে।
প্রবীণ ইমামের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা
বিগত ৪৬ বছর ধরে আল-আকসায় ইমামতি করা এক প্রবীণ ইমাম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আল-আকসা আজ বড় একা। গত কয়েক দশকে এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ইতিকাফ করত, সেখানে এখন বড়জোর চার-পাঁচজন মানুষ নিয়ে আমাদের নামাজ পড়তে হচ্ছে। ভেতরের স্পিকারে আজান ও নামাজ হওয়ায় বাইরের মানুষও কিছু শুনতে পান না।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি নিজের বাড়ির পাশের একটি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ান। সেখানে মুসল্লিরা তাকে দেখলে বলেন, “আজ আল-আকসার কণ্ঠ আমাদের মাঝে এসেছে।” তখন তার বুক ভেঙে কান্না আসে। সবাই একই প্রশ্ন করেন— “হে শায়খ, আল-আকসা কবে খুলবে?” কিন্তু তার কাছে এর কোনো উত্তর নেই।
দন্তচিকিৎসকের বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক চাল
পেশায় দন্তচিকিৎসক হলেও শখের বসে গত ১৫ বছর ধরে আল-আকসায় স্বেচ্ছায় আজান ও কোরআন তিলাওয়াত করেন মাজদ আল-হাদমি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে অবর্ণনীয় বঞ্চনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, নিরাপত্তা বা মরণাস্ত্রের হামলার আশঙ্কার কথা বলা হলেও আল-আকসার দেয়াল যেকোনো বাঙ্কারের চেয়েও শক্তিশালী। বাস্তবে এটি একটি রাজনৈতিক চাল। গত ১১ মাস ধরে জেরুজালেমের মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার যে চেষ্টা চলছে, এটি তারই অংশ।
ইসরাইলের ১০টি কঠোর পদক্ষেপ
জেরুজালেম গভর্নরেটের মিডিয়া ডিরেক্টর ওমর রাজুব আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের নেওয়া প্রধান ১০টি পদক্ষেপ তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আল-আকসাকে ঘিরে ইসরাইলের কড়াকড়ি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে মসজিদটির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
- পূর্ণাঙ্গ অবরুদ্ধ অবস্থা: ইরান-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ঘোষিত জরুরি অবস্থার অজুহাতে মসজিদটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
- ইবাদতে নজিরবিহীন বাধা: ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দশ দিনে মুসল্লিদের নামাজ আদায় ও ইতিকাফের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
- আংশিক থেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ: পুরো মাসজুড়ে জুমা ও শনিবারগুলোতে ইতিকাফে বাধা দেওয়ার ধারাবাহিকতায় এখন মসজিদটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে।
- প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে বাধা: মুসল্লি এবং মসজিদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা রসদ ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
- অস্ত্রধারী টহল: মসজিদের আঙিনায় ইবাদতকারীদের মাথার ওপর সার্বক্ষণিক সশস্ত্র সেনাসদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে।
- ইলমি মজলিস বন্ধ: মসজিদের ভেতরে দারুল হাদিসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা এবং শিক্ষার আসরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
- ওয়াকফ কমিটির ক্ষমতা খর্ব: জর্ডান পরিচালিত ইসলামি ওয়াকফ কমিটির প্রশাসনিক ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে ইসরাইল নিজেই মসজিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
- ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রশ্রয়: মুসলিমদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হলেও সকালে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।
- গণগ্রেফতার: প্রতিদিন মসজিদের আঙিনা থেকে সাধারণ মুসল্লিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
- বিতাড়ন ও নিষেধাজ্ঞা: বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩০ জনকে আল-আকসায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওয়াকফ কমিটির ২৪ জন কর্মচারী এবং ৬ জন ইমাম ও খতিব রয়েছেন।
পরিকল্পিত নীলনকশার অভিযোগ
গভর্নরেট কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিকে ইসরাইলি দখলদারিত্বের একটি পরিকল্পিত নীলনকশা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, জরুরি অবস্থার অজুহাতে জর্ডান পরিচালিত ওয়াকফ কমিটির ক্ষমতা খর্ব করে আল-আকসার ওপর সরাসরি ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য।
এদিকে মুসলিমদের জন্য মসজিদ বন্ধ রাখা হলেও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের পুরিম উৎসব পালনের জন্য হাজার হাজার মানুষকে জেরুজালেমের রাস্তায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক আচরণ ফিলিস্তিনিদের মাঝে আরও বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ফিলিস্তিনিদের উদ্বেগ: পরিচয় বদলের পরিকল্পনা
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের ধারণা, আল-আকসার এই নীরবতা শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণে নয়; বরং পবিত্র শহরটির জনতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। জেরুজালেম গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচবার আল-আকসায় জুমার নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অবরোধটি সবচেয়ে দীর্ঘ ও কঠোর।
ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, এই পদক্ষেপগুলি জেরুজালেমের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তনের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। আল-আকসার নীরবতা আজ ফিলিস্তিনি হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যা কেবল সময়ই নিরাময় করতে পারে।
