যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে, বিশ্বজুড়ে প্রভাব ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে, অনিশ্চয়তা বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে, বিশ্বজুড়ে প্রভাব ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে, এবং এই সংঘাতে ১২টি দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনুভূত হচ্ছে, তবে যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে, কোনও পক্ষই তাদের কাঙ্ক্ষিত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। উল্টো সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা তত বাড়ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য ও ইরানের হামলা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ শেষ হবে। তবে পরক্ষণেই তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘আরও অনেক দূর’ যাবে। অন্যদিকে, সোমবারই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মার্কিন কৌশল ও ইরানের প্রতিরোধ

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর চালানো হামলার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল যে ইরান সরকারের পতন ঘটবে অথবা তারা ভেনেজুয়েলার মতো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি। খামেনির কট্টরপন্থি ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রতিশোধের শপথ নিয়েছেন এবং ইরানে বড় ধরনের কোনও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের খবরও পাওয়া যায়নি।

তীব্র বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের প্রধান শহরগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা বজায় রেখেছে। এমনকি তারা বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

ইরানের কৌশল ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া

ইরানের কৌশল ছিল আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও সৌদি আরবের বিমানবন্দর, হোটেল এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে তাদের অর্থনীতি ধসিয়ে দেওয়া, যাতে তারা ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দেয়। তবে কুয়েত ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ বদর আল-সাইফ বলেন, ‘যা আমাদের ক্ষতি করছে তা ইরানিদেরও ক্ষতি করছে। আমাদের টিকে থাকার ক্ষমতা তাদের চেয়ে বেশি। আমরা সামলে নিতে পারব, কিন্তু তারা পারবে বলে মনে হয় না।’

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান আল-আনসারির মতে, ইরান বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত করার চেষ্টা করছে। সৌদি আরব আপাতত পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, কারণ এর প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। তিনি বলেন, ‘সংযম মানে দুর্বলতা নয়।’

বিশ্লেষকদের মতামত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে রাশিয়া। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে রাশিয়ার আয় বাড়বে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ ইউক্রেন থেকে সরে যাবে। কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ফেলো আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকো বলেন, ‘ক্রেমলিনের জন্য এই সংঘাত কয়েক মাস স্থায়ী হওয়া সুবিধাজনক।’

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ইরান বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ বলেন, ইরানের বিশাল ভূখণ্ড ও সামরিক কাঠামোর কারণে এখানে নিশ্চিত জয় পাওয়া সম্ভব নয়। ইরান এখন ট্রাম্পকে দেখাতে চায় যে এই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতির জন্য কতটা ভয়াবহ। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের প্রধান আলী ওয়ায়েজ বলেন, ইরানের ধারণা, সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফুরিয়ে আসবে এবং তখন তারা মিত্রদের ওপর বড় আঘাত হানতে পারবে।

তবে তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন, মোজতবা খামেনির পক্ষে ট্রাম্পের সঙ্গে কোনও চুক্তিতে আসা প্রায় অসম্ভব। বরং তিনি যেকোনও যুদ্ধবিরতির সুযোগকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারেন। সব মিলিয়ে অস্ত্র বিরতি হলেও পরিস্থিতি একটি অস্থিতিশীল ভারসাম্যে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।