ইরানের পানিসংকট: যুদ্ধে বোমা হামলায় জলশোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত, লাখ লাখ মানুষের জীবন হুমকিতে
ইরানের পানিসংকট: যুদ্ধে বোমা হামলা, জলশোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত

ইরানের পানিসংকট: যুদ্ধে বোমা হামলায় জলশোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত, লাখ লাখ মানুষের জীবন হুমকিতে

ইরান দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন ও অব্যবস্থাপনার কারণে পানিশূন্যতার সংকটে ভুগছে। চলমান যুদ্ধ এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে, যা এখন লাখ লাখ মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপের একটি লোনা পানি শোধন কেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়েছে। এই হামলার ফলে ওই অঞ্চলের ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ওয়াশিংটন এই অভিযোগের দায় অস্বীকার করেছে।

পাল্টাপাল্টি হামলা ও পানির অবকাঠামো হুমকি

এই ঘটনার রেশ ধরে ইরানও বাহরাইনের একটি পানি শোধন কেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামোগুলোতে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই হামলাগুলো লাখ লাখ মানুষের পানির নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করতে পারে। ইরানের রাজধানী তেহরান ইতিমধ্যেই এক কোটি মানুষের শহর হিসেবে বছরের পর বছর ধরে খরায় ভুগছে। গত বছরের শেষের দিকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় রাজধানীর জলাধারগুলোতে পানির স্তর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ইরানের আবহাওয়া সংস্থা হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, শহরগুলো ক্রমাগত পানিহীন অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের সতর্কতা ও রাজধানী স্থানান্তরের প্রস্তাব

যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন যে, পানিসংকট ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে তেহরান ‘বসবাসের অযোগ্য’ হয়ে পড়েছে। তিনি এমনকি রাজধানী স্থানান্তরেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে। ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক এরিক লোব বলেন, "ইরান আগে থেকেই সংকটের মধ্যে ছিল। পানিসংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকার ধারণ করেছে। এখন শাসনব্যবস্থা এসবের জন্য যুদ্ধকে দোষারোপ করার সুযোগ পাচ্ছে।"

কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পানিসংকটের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটি পানিনির্ভরতা বাড়াতে দ্রুত বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু এর অনেকগুলোই ভুল স্থানে তৈরি করা হয়েছিল। এরিক লোব ব্যাখ্যা করেন, "বাস্তুসংস্থান বা পানির চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আর মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।" সমালোচকরা এখন এসব খালি জলাধারকে ‘ব্যর্থতার স্মৃতিস্তম্ভ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাম্প করা ৫০টি ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের ৩২টিই ইরানে অবস্থিত। সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সিকিউরিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্সেসকো ফেমিয়া বলেন, গত ডিসেম্বরের বৃষ্টিপাতও ভূগর্ভস্থ পানিস্তর পূরণ করতে পারেনি, কারণ মাটি অত্যন্ত শুষ্ক ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়েছে।

সরকারের অগ্রাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অভাব

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ওমান সাগর থেকে পানি আমদানির কথা বলা হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, সরকার কখনোই পানিসংকট সমাধানে সিরিয়াস ছিল না। তাদের মতে, সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার জনস্বাস্থ্যের চেয়ে সামরিক শক্তি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। পরিবেশকর্মী ও কর্মকর্তারা এই ইস্যুতে সরব হতে চাইলেও তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার গ্লোবাল ওয়াটার সিকিউরিটি সেন্টারের পরিচালক মাইকেল এস গ্রেমিলিয়ন বলেন, "নিকট ভবিষ্যতে খরার প্রকোপ কমার কোনও লক্ষণ নেই।" তিনি সতর্ক করেন যে, পানিসংকটের সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ যোগ হলে তা চরম খাদ্যসংকট তৈরি করতে পারে এবং মানুষকে দেশান্তরী হতে বাধ্য করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের পানিসংকট শুধু একটি পরিবেশগত ইস্যু নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে দেশটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।