ইরানের বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: কেন শীর্ষ নেতা নিহত হলেও যুদ্ধ থামবে না
ইরানের রাজধানী তেহরানে বোমা হামলা হলে দেশটির যুদ্ধের সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। গত দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কৌশলগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ইরান এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতেও লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম। ইরানের সামরিক চিন্তাবিদদের ভাষায় এই কৌশলের নাম ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স বা বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা ইরানের সামরিক প্রস্তুতির নতুন দিকগুলো উন্মোচন করে।
'মোজাইক ডিফেন্স' কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
এই প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল ভিত্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান তার শীর্ষ কমান্ডার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হারালেও যুদ্ধ থামবে না। ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) প্রধান থাকা মোহাম্মদ আলী জাফারি এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। এই মডেলে পুরো রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ৩১টি প্রদেশে আধা-স্বায়ত্তশাসিত স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যদি কেন্দ্রীয় কমান্ড ভেঙে পড়ে বা শীর্ষ নেতারা নিহত হন, তবুও স্থানীয় ইউনিটগুলো নিজস্ব সিদ্ধান্তে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর লক্ষ্য হলো একটি মাত্র বিধ্বংসী হামলায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঠেকানো এবং শত্রুপক্ষকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলা।
'চতুর্থ উত্তরাধিকারী' পরিকল্পনা: নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা
এই কৌশলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো চতুর্থ উত্তরাধিকারী পরিকল্পনা। রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহতের আগেই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক পদের জন্য অন্তত চারজন করে উত্তরসূরি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। অর্থাৎ, একজন নেতা নিহত বা নিখোঁজ হলে তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ ব্যক্তি দায়িত্ব বুঝে নেবেন। এটি করা হয়েছে যাতে নেতৃত্বের শূন্যতায় কোনোভাবেই সামরিক পক্ষাঘাত তৈরি না হয় এবং যুদ্ধের গতি বজায় থাকে। এই ব্যবস্থা ইরানের স্থিতিশীলতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মত দেন।
ইরান কেন এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেছে?
২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর সাদ্দাম হোসেনের পতন দেখে ইরান এই শিক্ষা নিয়েছে যে, অতি-কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় শীর্ষ কাঠামোয় আঘাত করলে দ্রুত পতন ঘটে। তাই ইরান তার শক্তি এক জায়গায় ধরে না রেখে ছড়িয়ে দিয়েছে, যা যুদ্ধের সময় স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়। ইরানের এই ডকট্রিনের দুটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে:
- প্রথমত, কমান্ড সিস্টেমকে ধ্বংস করা অসম্ভব করে তোলা।
- দ্বিতীয়ত, যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করে শত্রুর জন্য তা ব্যয়বহুল ও অসহনীয় করে তোলা।
এই কৌশলটি মূলত মাও সে তুং-এর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তত্ত্বের আদলে গড়ে উঠেছে, যা ইরানকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছে যে শীর্ষ নেতার মৃত্যুও যুদ্ধের সমাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
যুদ্ধের ময়দানে প্রয়োগ: কীভাবে কাজ করে এই ব্যবস্থা?
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) প্রথম ধাক্কা সামলানোর দায়িত্ব পালন করে। এরপর আইআরজিসি এবং বাসিজ বাহিনী গেরিলা কায়দায় চোরাগোপ্তা হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি লড়াই শুরু করে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী স্থানীয় কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়, যা যুদ্ধের গতিশীলতা বজায় রাখে। সমুদ্রপথে হরমুজ প্রণালিতে ছোট দ্রুতগামী বোট, মাইন এবং জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে শত্রু চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়। পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধকে কেবল ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে, যা সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত করে।
সময় যখন অস্ত্র: অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
ইরানের কৌশলে যুদ্ধ মানে কেবল গোলাবর্ষণ নয়, এটি একটি সহনশীলতার পরীক্ষা। উদাহরণস্বরূপ, একটি 'শাহেদ' ড্রোন তৈরি করতে ইরান যে সামান্য অর্থ ব্যয় করে, তা ধ্বংস করতে শত্রুপক্ষকে তার চেয়ে বহুগুণ দামী ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করতে হয়। এভাবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে শত্রুর অর্থনীতি ও মনোবলের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই তেহরানের মূল লক্ষ্য। এই পদ্ধতি ইরানকে একটি স্থিতিস্থাপক ও কৌশলগত সুবিধা দেয়, যা আধুনিক যুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে।
মোটকথা, ইরানের বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা কৌশল দেশটিকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধের ফলাফল শুধু সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করে না, বরং স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উপরও নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থা ইরানের নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্তরে তার প্রভাব বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
