ইরানের 'মোজাইক ডিফেন্স' কৌশল: সাদ্দামের পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে মার্কিন-ইসরাইলি হুমকি মোকাবেলা
ইরানের মোজাইক ডিফেন্স: সাদ্দামের পতন থেকে শিক্ষা

ইরানের 'মোজাইক ডিফেন্স': সাদ্দামের পতন থেকে নেয়া কৌশলগত শিক্ষা

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টিকে থাকতে এবং মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হুমকি মোকাবেলায় ইরান একটি অভিনব সামরিক কৌশল গ্রহণ করেছে, যার নাম 'মোজাইক ডিফেন্স'। এই কৌশল মূলত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সামরিক ধারণা, যা বিশেষভাবে এগিয়ে নিয়েছেন সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জাফরি (২০০৭–২০১৯)।

মোজাইক ডিফেন্স কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

এই কৌশলের মূল নীতি হলো রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে একক কমান্ডের অধীনে না রেখে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আংশিক স্বাধীন স্তরে বিভক্ত করা। ফলে কোনো বড় হামলায় একটি কমান্ড ধ্বংস হলেও পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে না। এই ব্যবস্থায় আইআরজিসি, বাসিজ, নিয়মিত সেনাবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী এবং স্থানীয় কমান্ড—সবাই একটি ছড়ানো নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে সমন্বিতভাবে কাজ করে।

যদি কোনো অংশ ধ্বংস হয়, অন্য অংশগুলো স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। শীর্ষ নেতা নিহত হলেও কমান্ড কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।

এই নীতির দুটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে:

  1. ইরানের কমান্ড ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা কঠিন করে তোলা
  2. যুদ্ধক্ষেত্রকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাতে দ্রুত ফলাফল নির্ধারণ করা কঠিন হয়

কেন ইরান এই কৌশল গ্রহণ করল?

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে আগ্রাসন এবং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি ইরানের কৌশলগত চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সাদ্দাম হোসেনের অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার দ্রুত পতন ইরানের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবে কাজ করে। তারা প্রত্যক্ষ করেছিল, কীভাবে একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র কাঠামো মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে অল্প সময়েই ধসে পড়ে।

ফলে ইরান সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বদলে তারা সামরিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং ছড়িয়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে।

যুদ্ধের সময় মোজাইক ডিফেন্সের কার্যকারিতা

এই কৌশল অনুযায়ী ইরানের বিভিন্ন বাহিনীর আলাদা আলাদা ভূমিকা নির্ধারিত রয়েছে:

  • ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী 'আরতেশ' প্রথম আঘাত সামলানোর দায়িত্ব পায়। তাদের ট্যাংক, যান্ত্রিক ইউনিট ও পদাতিক বাহিনী শত্রুর অগ্রগতি ধীর করতে সচেষ্ট হয়।
  • বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ছদ্মবেশ, বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থান ব্যবহার করে শত্রুর আকাশশক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
  • এরপর আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনী যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত করে—নিয়মিত হামলা, ওঁত পেতে আক্রমণ, সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত করা এবং স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে।

বাসিজ বাহিনী এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইরান বিপ্লবের নেতা রুহুল্লা খোমেনি, যা পরবর্তীতে আইআরজিসির কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। ২০০৭ সালের পর বাসিজ ইউনিটগুলোকে ইরানের ৩১টি প্রদেশভিত্তিক কমান্ড ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়, যাতে স্থানীয় কমান্ডাররা পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মোজাইক ডিফেন্স কৌশল ইরানকে মার্কিন-ইসরাইলি সম্ভাব্য যৌথ হামলার মুখে অধিকতর স্থিতিস্থাপকতা প্রদান করেছে। সাদ্দাম হোসেনের পতন থেকে নেয়া এই শিক্ষা ইরানের সামরিক কৌশলকে পুনর্বিন্যাস করতে সাহায্য করেছে, যা আধুনিক যুদ্ধে একটি বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা মডেলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে।