ইরানের ভূগর্ভস্থ 'মিসাইল সিটি' যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৩,০০০-এরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে। গত এক দশকে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরানের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন
ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও, তাদের প্রচলিত অস্ত্রের ভান্ডার পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইরানের বিমানবাহিনী দুর্বল হওয়ায়, তাদের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো।
সামরিক বিশ্লেষক গিয়ের্মো পুলিদোর মতে, ইরানের প্রায় ২,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়াও ইরানের কাছে বিপুল সংখ্যক 'কামিকাজে ড্রোন' ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা তাদের সামরিক শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করেছে।
'মিসাইল সিটি'র গোপন স্থাপনা
সম্ভাব্য যুদ্ধের হুমকি মোকাবিলায় ইরান বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলেছে 'মিসাইল সিটি' নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি। পুলিদো ব্যাখ্যা করেন যে, এগুলো পাহাড়ের গভীরে খোদাই করা বিশেষ স্থাপনা, যার কিছু অংশ মাটির ৫০০ মিটার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই গোপন ঘাঁটিগুলোতে শাহাব-৩, সেজিল ও খোররামশাহরের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা হয়, যা ২,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে আঘাত করতে সক্ষম। তবে পুলিদো সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই ঘাঁটিগুলোর প্রবেশপথ ও উৎক্ষেপণ পথ ধ্বংস করতে পারলে এগুলো সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়বে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া ও নতুন যুদ্ধ কৌশল
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে দাবি করেছে যে, তারা তাবরিজ এলাকায় একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে সফল হামলা চালিয়েছে। পুলিদো এই সংঘাতকে 'সালভো যুদ্ধ' নামে অভিহিত করেছেন, যা যুদ্ধের একটি নতুন ধারা নির্দেশ করে।
এই নতুন ধরনের যুদ্ধে ভূমি দখল নয়, বরং প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ধ্বংস করাই মুখ্য লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ বা বিমানের পরিবর্তে এখন যুদ্ধের ময়দান দখল করেছে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো।
ইরানের প্রধান সামরিক ঘাঁটি
ইরানের সবচেয়ে বড় 'মিসাইল সিটি' অবস্থিত লোরেস্তান প্রদেশের খোররামাবাদে। পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের তাবরিজ ঘাঁটি দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের পূর্বাঞ্চলেও আঘাত হানতে পারে। ইসফাহানে রয়েছে ইরানের সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, যা তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব
সামরিক বিশ্লেষক হেসুস পেরেজ ত্রিয়ানা উল্লেখ করেছেন যে, এই যুদ্ধের চাবিকাঠি হবে গোয়েন্দা তথ্য। সঠিক গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে 'মিসাইল সিটি'গুলো শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারলেই এই সংঘাতের চূড়ান্ত ফয়সালা সম্ভব হবে। এই প্রেক্ষাপটে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য নির্ভর করছে গোপন এই ঘাঁটিগুলো রক্ষা ও আক্রমণের জটিল কৌশলের উপর।
ইরানের এই ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামো শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলোতে এই ধরনের গোপন ঘাঁটির গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে, যা আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।
