মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার রেশ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়। হামলার পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, ইরান আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
পারমাণবিক অস্ত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে মধ্যম ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। প্রায় ৪৭ বছর ধরে নানা ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এই বাস্তবতায় আত্মরক্ষার যুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা ইরানের মধ্যে থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলকে অনেকেই পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র মনে করেন, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়। ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা উদ্বেগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানে পারমাণবিক প্রযুক্তির সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়, সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে। শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তেহরানের সঙ্গে এই সহযোগিতা গড়ে ওঠে এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।
ঐতিহাসিক সম্পর্কের পরিবর্তন ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ ছিল। তুরস্কের পর দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে ইরান ১৯৫০ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে ইসলামি বিপ্লব এই সমীকরণ আমূল বদলে দেয়। নতুন শাসনব্যবস্থা ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। এখান থেকেই আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
বিপ্লবের পর শিয়া উত্থানের আশঙ্কা তুলে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুন্নি বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে। গত চার দশকে আঞ্চলিক সংঘাত, প্রক্সি যুদ্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুল রক্তক্ষয় ঘটেছে। তেলসমৃদ্ধ সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন টানাপোড়েনে রয়েছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্ন এই দূরত্ব বাড়িয়েছে।
ইসরায়েলের ভূখণ্ড দাবি ও রাজনৈতিক প্রভাব
ইসরায়েলের রাজনীতিতে বৃহত্তর ভূখণ্ডের ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। কিছু কট্টর জায়নবাদী গোষ্ঠী ‘এরেটজ ইসরায়েল হাসলেমা’ ধারণায় বিশ্বাস করে। তাদের ব্যাখ্যায় এই ভূখণ্ড কেবল পশ্চিম তীর ও গাজায় সীমাবদ্ধ নয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের পতাকার প্রতীকেই রয়েছে বিস্তৃত ইসরায়েলের ধারণা।
ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অনেকেই এই কট্টর জাতীয়তাবাদী ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করেন। যদিও রাষ্ট্রীয় নীতিতে এমন বিস্তৃত ভূখণ্ড দাবির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই, তবু এই ধারণা ঘিরে বিতর্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। ধর্মীয় বয়ান ও আধুনিক রাষ্ট্রনীতির এই মিশ্রণ অঞ্চলটির রাজনীতিকে সংবেদনশীল করে তুলেছে।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ তেল মজুত রয়েছে, যার পরিমাণ আনুমানিক ২০৮ থেকে ২০৯ বিলিয়ন ব্যারেল। বর্তমানে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের বড় অংশ, প্রায় ৮০ শতাংশ, রপ্তানি হয় চীনে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর প্রভাব বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য গভীর। দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালি অচল হওয়ায় তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
ইরান এই যুদ্ধে পরাস্ত হলে দেশটির ভেতরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ইরানের সমাজ বহু জাতিগত ও ভাষাগত গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। কুর্দি, আজারি, বালুচ ও তুর্কি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাবির প্রশ্ন আবারও জোরালো হতে পারে। কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হলে গৃহসংঘাত বা বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা বাড়তে পারে।
এতে আঞ্চলিক অখণ্ডতা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যেতে পারে। চলমান সংঘাত এখন পর্যন্ত আকাশপথ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে তাতে স্থল অভিযানের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আঞ্চলিক সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান জোরদারে ওয়াশিংটনের সমর্থন ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী। একই সঙ্গে অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির অবস্থানও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



