মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত যুদ্ধ: ইরানের তেল স্থাপনায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা, জবাবে আঞ্চলিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ
ইরানের তেল স্থাপনায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত যুদ্ধ: ইরানের তেল স্থাপনায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা। রোববার (৮ মার্চ) যুদ্ধের নবম দিনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় বিমান হামলা চালানো হয়। রাজধানী তেহরান ও এর পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি তেল ডিপো ও শোধনাগারে এই হামলায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আগুনে রক্তাভ আকাশ ও ‘আগুনের নদী’

হামলার পরপরই কুণ্ডলী পাকানো ভয়াবহ আগুনে রাতের আকাশ রক্তাভ রং ধারণ করে। বিধ্বস্ত তেল ডিপো থেকে নালা দিয়ে ছড়িয়ে পড়া তেল সড়কের পাশে ‘আগুনের নদী’ তৈরি করে। দিনের বেলায় তেহরানের আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, সূর্য দেখা দুষ্কর হয়ে ওঠে। এসব হামলায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিবর্তন

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার শুরুতে নিশানা ছিল মূলত তেহরানের সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষস্থানীয় নেতারা। যদিও তারা বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে। কিন্তু গতকালের হামলায় সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ইরানের তেল তথা জ্বালানি স্থাপনাগুলো। এই হামলা যুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরানের পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক প্রভাব

গতকালের হামলার জবাবে ইরান সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে এক বাংলাদেশি ও এক ভারতীয় নাগরিক নিহত হন। কুয়েতে বিমানবন্দর, জ্বালানি ডিপো ও নিরাপত্তা ভবনে হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত।

অন্যান্য আঞ্চলিক হামলা

ইসরায়েলে: গতকাল ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফাসহ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে ইসরায়েলে তিনজন আহত হয়েছেন।

বাহরাইনে: ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার সময় টুকরা অংশ পড়ে তিনজন আহত হয়েছেন।

ইরাকে: এরবিলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে।

লেবাননে: ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে দুই সেনা নিহত হয়েছেন। লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া

ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘একটা সময় আসবে যখন ইরানে ‘আত্মসমর্পণ করছি’ বলার মতো কোনো লোক থাকবে না।’ তবে তাঁর এ হুঁশিয়ারির মধ্যেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা বেছে নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানের বিশেষজ্ঞ পর্ষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট)। যদিও গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নাম ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হামলার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে ইরান। এসব হামলার কঠোর জবাব দেবে তাঁর দেশ।

যুদ্ধের ক্রমবিকাশ ও হতাহত

২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পর থেকে দফায় দফায় দেশটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে ইরান। চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান ছাড়া এসব দেশে ৩৩ জন নিহত হয়েছেন।

ইরানে নিহতের সংখ্যার হালনাগাদ তথ্য দুই দিন ধরে জানানো হচ্ছে না। গত শুক্রবার দেশটির রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছিল, দেশটিতে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। দেশটিতে গতকালের হামলায় নিহত ৪১ জন হিসাবে আনলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৭৩।

স্থানীয়দের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

তেহরানের এক বাসিন্দা গতকাল সিএনএনকে বলেন, ‘গত রাতে আমি বিস্ফোরণ দেখেছি, যা আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল যেন কিয়ামত শুরু হয়েছে কিংবা আমি দোজখকে ঠিক যেভাবে কল্পনা করি, এটি ছিল অনেকটা তেমনই।’ পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে তিনি কিয়ামতের সঙ্গে তুলনা করেন।

পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

এদিকে তেলের স্থাপনায় হামলার ফলে বিষাক্ত বৃষ্টি ঝরার বিষয়ে সতর্ক করেছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট। এটি ত্বক ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ধরনের বৃষ্টির সময় লোকজনকে বাসাবাড়িতে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তেল স্থাপনায় হামলার পর নাগরিকদের তেল নেওয়ার সীমা কমিয়ে দিয়েছে তেহরানের প্রশাসন। শহরের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান বলেছেন, একজন ব্যক্তি এখন দিনে ২০ লিটার তেল নিতে পারবেন, আগে যা ৩০ লিটার ছিল। তবে জনগণকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গভর্নর বলেন, শিগগিরই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

অন্যান্য স্থানে হামলা

গতকাল ইরানের ইসফাহানে একটি বিমানবন্দর, কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও একটি ক্লাবে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছেন বলে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে। তেহরান ও কারাজে তেলের ডিপোতে হামলায় নিহত হয়েছেন ১০ জন। নাজাফাবাদ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২০ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন। সেখানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উদ্ধারকাজ চলাকালে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইরানের পানি শোধনাগারেও হামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।