ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে উত্তর কোরিয়ার নীরবতা: কিম জং উনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক দোটানা
গত সপ্তাহে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া আগ্রাসী যুদ্ধের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তবে রহস্যজনকভাবে তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও দেশটির ডজনখানেক শীর্ষ নেতার মৃত্যুর খবর সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা অনিচ্ছাকৃত নয়; বরং এটি উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি সচেতন কৌশল।
নেতার 'অজেয়' ভাবমূর্তি রক্ষার লড়াই
উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের নেতার 'অজেয়' ভাবমূর্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্য কোনও শক্তিশালী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার এমন পতন বা হত্যার খবর প্রচার করা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এটি উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষকে এই বার্তা দিতে পারে যে, কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকা নেতার ওপরও নজরদারি চালানো বা তাকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এখন বড় এক দোটানায় রয়েছেন।
কিম জং উনের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
কিম জং উন কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করবেন, নাকি নীরব থাকবেন? মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ট্রাম্পের কূটনীতি থেকে হঠাৎ সামরিক শক্তিতে রূপান্তরের কৌশলটি কিম ও তার ঘনিষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় তৎকালীন নেতা কিম জং ইল কয়েক সপ্তাহ জনসম্মুখ থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। কিম জং উন ইতোমধ্যে জনসমক্ষে এসেছেন, অর্থাৎ তিনি লুকিয়ে নেই। গত বুধবারও তিনি উত্তর কোরিয়ার নতুন যুদ্ধজাহাজ চো হাইওন থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পরিদর্শন করেছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার প্রস্তুতি
খামেনির মতো পরিণতি এড়াতে কিমের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন ইরানের অভিযানের প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করছে। কিমের নিরাপত্তায় ডিকয় মোটরকেড (ছদ্মবেশী গাড়ি বহর), হঠাৎ ভেন্যু পরিবর্তন এবং কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবহার করা হয়। এমনকি তার চারপাশে থাকা দেহরক্ষীদের হাতে বিশেষ 'ব্যালিস্টিক ব্রিফকেস' দেখা যায়, যা গুলির সময় ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পিয়ংইয়ংয়ের গভীরে এবং পাহাড়ে কিমের জন্য বিশালাকার আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টার রয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।
কিমের আত্মবিশ্বাস ও কৌশলগত অবস্থান
বাবার চেয়ে কিম জং উন এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। উত্তর কোরিয়া এখন কয়েক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেডের অধিকারী। তাদের দাবি, এই অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। তা ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্ব এখন তুঙ্গে। ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার বিনিময়ে কিম পুতিনের কাছ থেকে খাদ্য, জ্বালানি ও স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি পাচ্ছেন।
২০১৯ সালের হ্যানয় সম্মেলনের স্মৃতি
২০১৯ সালের হ্যানয় সম্মেলনের তিক্ত অভিজ্ঞতা কিম নিশ্চয়ই ভোলেননি। সেবার ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে কোনও চুক্তি ছাড়াই আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই আলোচনার সময়ই মার্কিন নেভি সিল উত্তর কোরিয়ায় আড়িপাতার যন্ত্র বসাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। এর অর্থ হলো, কূটনীতি চললেও গোয়েন্দা তৎপরতা ও সামরিক পরিকল্পনা থেমে থাকে না। ইরানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। একদিকে আলোচনা চলেছে, অন্যদিকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে চূড়ান্ত আঘাত হানা হয়েছে।
ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্ভাবনা
ফেব্রুয়ারির শেষে উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে কিম আলোচনার পথ কিছুটা খোলা রেখেছেন। তবে তার শর্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে হবে। ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের সম্পর্ক সবসময়ই ব্যক্তিগত পর্যায়ের। ট্রাম্প কিমকে 'বন্ধু' হিসেবেও সম্বোধন করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে উত্তর কোরিয়ার কোনও উল্লেখ ছিল না। এই পরিস্থিতিতে, কিম জং উনের পরবর্তী পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
