ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা: বাংলাদেশিদের মনোজগতে দ্বন্দ্ব ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষত বাংলাদেশিদের মধ্যে এটি সমর্থন ও সহানুভূতি নিয়ে গভীর দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে। বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী মধ্য তেহরানের আকাশে ভেসে উঠলেও, বাংলাদেশিদের মনোজগতে এই সংঘাতের প্রতিধ্বনি আরও জটিল।
সমর্থনের দ্বন্দ্ব: ফিলিস্তিনি আবেগ বনাম প্রবাসী নিরাপত্তা
অনেক বাংলাদেশির মন আবেগে টানে ইরানের দিকে, কারণ ইরান দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই বিশ্বাস বহু মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত। ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতার প্রশ্নে ইরানের পরাজয়কে অনেকে মৃত্যুঘণ্টা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু অন্যদিকে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমজীবী মানুষের জীবন-মরণ উৎকণ্ঠা।
এই অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিরা বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। আজ তারা ড্রোন ও বোমার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, যা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে আবেগ ও বাস্তবতার সংঘাত, যেখানে সমর্থনের পাল্লা কোথায় ঝুঁকবে তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও অভ্যন্তরীণ দ্বিধা
এই যুদ্ধ শুরু করেছে মার্কিনিরা—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উৎখাত বা ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির যুক্তি দেখালেও, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইরানকে আসন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী হামলা বন্ধের একটি প্রস্তাব মাত্র সাত ভোটের ব্যবধানে নাকচ হয়েছে, যা যুদ্ধ নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বিধা নির্দেশ করে।
বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ খুব জনপ্রিয় নয়; মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এটি সমর্থন করেন। ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সামরিক সমর্থন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম ইসরায়েলকে ‘বর্ণবাদী রাষ্ট্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। সময়ের পরিবর্তনে, ইসরায়েলপন্থী লবিগুলোর প্রভাবও কমছে, যেমন এইপ্যাকের সমর্থন এখন নেতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আবেগের টানাপোড়েন
ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলা বাংলাদেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, কিন্তু সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কও রয়েছে। এই দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি অর্থনৈতিক স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা এই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আগে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হতো।
এই সংঘাত শুধু ভূরাজনীতিতে নয়, বাংলাদেশিদের মনোজগতেও পরিবর্তন আনছে। ফিলিস্তিনি আবেগ অনেক মুসলিম দেশের মানুষের সহানুভূতি ইরানের দিকে ঝুঁকিয়ে দিলেও, প্রবাসী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বাস্তবতা দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে তুলছে। ফলে, সমীকরণ বদলাচ্ছে এবং অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ, একজন শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে, এই জটিল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশিদের অবস্থানকে প্রতিফলিত করেছেন। তাঁর মতে, এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না থাকলেও, সমর্থনের প্রশ্ন ক্রিকেট বা ফুটবলের মতোই সামনে চলে আসে, যা আমাদের দৈনন্দিন আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
