ট্রাম্পের 'দেলসি মডেল': ভেনেজুয়েলা সাফল্যের পর ইরানে প্রয়োগের আগ্রহ
ট্রাম্পের 'দেলসি মডেল': ভেনেজুয়েলা পর ইরানে প্রয়োগের আগ্রহ

ট্রাম্পের 'দেলসি মডেল': ভেনেজুয়েলা থেকে ইরানে শাসন পরিবর্তনের কৌশল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি অভিনব কৌশল ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই কৌশলের মূল উপাদান হলো—প্রথমে লক্ষ্যবস্তু দেশের নেতাকে শনাক্ত করা, তারপর মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তাকে অপসারণ করা এবং শেষে ওয়াশিংটনের অনুগত একজন উত্তরসূরিকে ক্ষমতায় বসানো।

ভেনেজুয়েলায় সফল প্রয়োগ

এ বছর ৩ জানুয়ারি ভোররাতে মার্কিন বাহিনী কারাকাস থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসেন। এই ঘটনা লাতিন আমেরিকার দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে।

গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে রদ্রিগেজ লেখেন, 'তাঁর সরকার একসঙ্গে কাজ করার সদয় ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, এ জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ।' এটি ছিল মাদুরোর পতনের পর দেলসির সবচেয়ে নির্ভীকচিত্তে ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

ইরানে প্রয়োগের আগ্রহ

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর পতনের দুই মাস পর ট্রাম্প ইরানে 'শাসনব্যবস্থার দখল' নিতে একই মডেল আবার প্রয়োগ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানে যৌথ আগ্রাসন চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে।

ট্রাম্প এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসকে বলেন, 'আমাকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে হবে, ভেনেজুয়েলায় দেলসির বেলায় যেমনটা হয়েছিল।' নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা ভেনেজুয়েলায় যা করেছি, আমি মনে করি, সেটাই যথাযথ।'

বিশেষজ্ঞদের সংশয়

যদিও লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মনে এই কৌশল নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে। তাদের মতে, যে কৌশল কারাকাসে কাজ করেছে, তা সাত হাজার মাইল দূরের তেহরানে কার্যকর হবে না।

হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের দক্ষিণ আমেরিকা বিভাগের সাবেক পরিচালক বেঞ্জামিন গেডান বলেন, 'ইরানকে এমন একটি পুতুল সরকারব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার ইচ্ছা ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক কম বাস্তবসম্মত।'

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, 'কেউ যদি ভেবে নেয়, ভেনেজুয়েলার পর যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে ঘুরে হস্তক্ষেপ করতে পারবে এবং যেখানে আমাদের বিমানবাহী রণতরি থামে, সেখানেই দেলসি রদ্রিগেজের মতো একজনকে ক্ষমতায় বসাবে, তবে সেটা খানিকটা হাস্যকরই হবে।'

ইরানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশটির পরবর্তী নেতা নির্বাচনে যুক্ত থাকার ট্রাম্পের দাবি খুব সম্ভবত সেখানে এখনো বেঁচে থাকা কর্মকর্তারা দারুণভাবে প্রত্যাখ্যান করবেন। কারণ, এটি তাদের কাছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে।

ইরানের অতীতে যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, যার সূত্রপাত মূলত বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাবকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া গণ-অসন্তোষ থেকেই হয়েছিল।

পরিকল্পনার অভাব

ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রকল্পবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স ভাতানকা ইরানের নেতা নির্বাচনে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের চেষ্টাকে 'একেবারেই বিভ্রান্তিকর' বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইরানে ভেনেজুয়েলা ধাঁচের পরিস্থিতি আরোপ করার জন্য ট্রাম্পের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা আছে কি না।

ভাতানকা বলেন, 'তিনি মূলত শিয়া মিলিট্যান্ট ইসলামিস্টদের তাঁর 'মাগা' আন্দোলনে রূপান্তর করতে চাইছেন। এর চেয়ে সরকার পরিবর্তন বরং অনেক সহজ হতো।'

সামরিক বাহিনীর ভূমিকা

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের হাতে। এই অভিজাত বাহিনী ইরানের সামরিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশ পরিচালনা করে।

গেডান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'এখন থেকে এক বছর পরে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থান না করে, ভেনেজুয়েলাবাসী হয়তো ধীরে ধীরে আবার কিছু স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবে, কিছুটা স্বায়ত্তশাসন ফিরে পাবে।'

তিনি আরও যোগ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত মাদুরোর উত্তরসূরিদের পক্ষেও যেতে পারে, কারণ 'আজীবন পুতুল সরকার হয়ে থাকার কোনো পরিকল্পনা নিশ্চয়ই তাদের নেই।'