ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি ডলারের থাড রাডার ধ্বংস, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চাপ
ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের থাড রাডার ধ্বংস

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিরক্ষা রাডার সম্পূর্ণ ধ্বংস

ইরানের সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান প্রতিরক্ষা রাডার সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত এই রাডারটি মার্কিন থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। স্যাটেলাইট ছবি থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আরটিএক্স কর্পোরেশন দ্বারা নির্মিত এএন/টিপিওয়াই২ রাডার এবং এর সকল সহায়ক সরঞ্জাম সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

রাডারের মূল্য ও কৌশলগত গুরুত্ব

এই ধ্বংসপ্রাপ্ত রাডারটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। থাড ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি রয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামেও অবস্থান করছে। প্রতিটি থাড ব্যাটারির মোট মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে রাডারটির অংশই ৩০০ মিলিয়ন ডলার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ টম কারাকোর মতে, "এগুলো অত্যন্ত বিরল কৌশলগত সম্পদ, এবং এই ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত ব্যাপক।"

হামলার সময় ও অবস্থান

একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক দিনগুলিতেই এই হামলাটি সংঘটিত হয়। থিঙ্ক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের তথ্যমতে, জর্ডানে ইরানের দুটি পৃথক হামলার খবর পাওয়া গেছে—একটি ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং অপরটি ৩ মার্চ। যদিও উভয় হামলা প্রতিহত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তবে থাড রাডার ধ্বংসের ঘটনাটি একটি বড় সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের সেন্টার অন মিলিটারি অ্যান্ড পলিটিক্যাল পাওয়ারের উপপরিচালক রায়ান ব্রোবস্ট উল্লেখ করেন, "যদি এই হামলাটি সফল হয়ে থাকে, তবে এটি ইরানের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল সামরিক অভিযানগুলোর একটি হয়ে থাকবে।"

থাড ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বর্তমান চাপ

থাড ব্যবস্থার প্রাথমিক কাজ হলো আকাশের উচ্চ স্তরে উড়ন্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে শনাক্ত করে ধ্বংস করা। এটি প্যাট্রিয়টের মতো স্বল্প পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও শক্তিশালী হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। তবে বর্তমানে এএন/টিপিওয়াই২ রাডারটি অকার্যকর হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ওপর পড়েছে। অথচ পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইতিমধ্যেই হ্রাস পেয়েছে বলে জানা গেছে।

একটি সম্পূর্ণ থাড ব্যাটারিতে সাধারণত নিম্নলিখিত উপাদানগুলো থাকে:

  • ৯০ জন সেনা সদস্য
  • ছয়টি ট্রাকভিত্তিক লঞ্চার
  • প্রতি লঞ্চারে আটটি করে মোট ৪৮টি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র
  • একটি টিপিওয়াই ২ রাডার
  • একটি ফায়ার কন্ট্রোল ও যোগাযোগ ইউনিট

এই ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লকহিড মার্টিন কর্তৃক নির্মিত হয় এবং প্রতিটির মূল্য প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার।

অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি ও প্রতিক্রিয়া

যুদ্ধ শুরুর সময় কাতারে অবস্থিত আরেকটি মার্কিন রাডারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণা সংস্থা জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হামলায় এএন/এফপিএস-১৩২ নামক এই স্থায়ী রাডারটি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যদিও এই রাডারটি দূরবর্তী হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম, কিন্তু সরাসরি অস্ত্র নিক্ষেপে এটি ব্যবহৃত হয় না।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, থাড এবং পিএসি-৩ এর মতো উন্নত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত হ্রাস পেতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লকহিড মার্টিন ও আরটিএক্সের মতো প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। পেন্টাগন এখন দ্রুততার সাথে অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছে, যাতে সামরিক সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়।