মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক হতাহত ও মানবিক সংকট
ইরানের রাজধানী তেহরানের এক বাসিন্দার কথায় ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ভয়াবহতা: 'যুদ্ধ শুরু হবে জানতাম। জানতাম দুঃখের দিন আসবে। তবে এত তাড়াতাড়ি আসবে বুঝতে পারিনি।' গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা এক সপ্তাহ ধরে ইরানে নির্বিচার হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যা এখন মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতে ইরানে ইতিমধ্যে শিশুসহ এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, আর জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে অঞ্চলটিতে মানবিক জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
হামলার নতুন ধাপ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
গতকাল শুক্রবার যুদ্ধের সপ্তম দিনে ইসরায়েল 'লায়ন রোর' অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার ঘোষণা দেয়, আর যুক্তরাষ্ট্র বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালায়—গত বছরের জুনে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের পর এই প্রথম এমন বিমান ব্যবহার করছে মার্কিন বাহিনী। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির হিসাবে, গতকাল পর্যন্ত হামলায় ১,৩৩২ জন নিহত হয়েছেন, যদিও মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বুধবার জানিয়েছিল নিহতের সংখ্যা ১,০৯৭, যার মধ্যে প্রায় ২০০ শিশু।
হতাহতের পাশাপাশি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ১১টি হাসপাতাল, ৮টি জরুরি মেডিক্যাল সেন্টার ও ১২টি অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট আরও জানায়, গত সপ্তাহে ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩,০৯০টি বাসাবাড়ি। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তত ২০০ শিশু নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগ মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় প্রাণ হারায়।
মানবিক সংকট ও শরণার্থীদের পালানো
যুদ্ধের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুসারে, ৮৪ হাজারের বেশি মানুষ লেবানন থেকে পালিয়েছে, আর তেহরানে ১ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ২০ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিককেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। লেবাননের এক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি আল-জাজিরাকে বলেন, 'আমরা পশু নই। আমরা মানুষ। শীতে আমাদের বাচ্চারা জমে যাচ্ছে।'
ইউএনএইচসিআরের পরিচালক আয়াকি ইতো সতর্ক করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও যুদ্ধ বন্ধের জন্য কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন, উল্লেখ করে যে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুদ্ধের প্রসার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইসরায়েলি বাহিনী গতকাল জানিয়েছে যে তারা যুদ্ধের নতুন ধাপ শুরু করেছে, ইরানের সরকারি অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় ইরানে প্রায় ২০০ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে তেহরানের একটি সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী এলাকা অন্তর্ভুক্ত। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, গতকাল ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর ও অন্যান্য শহরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, যেখানে মার্কিন প্রশাসন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লড়াই চালানোর পরিকল্পনা করছে বলে খবর। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েইনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে ইরান নতুন প্রযুক্তি ও অস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুদের 'যন্ত্রণার' মুখোমুখি করবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোকে সময়ের অপচয় বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই সংঘাতে লেবাননেও হামলা তীব্র হয়েছে, যেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২১৭ হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৬৮৩ জন। সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বেসামরিক জনগণের জন্য চরম দুর্ভোগ ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত হস্তক্ষেপ কামনা করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ।
