স্পেনের ৬৮% মানুষ ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরোধী, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
স্পেনের ৬৮% মানুষ ইরান যুদ্ধের বিরোধী, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি

স্পেনের বিপুল জনসমর্থন: ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ৬৮% নাগরিকের কঠোর অবস্থান

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানে চলমান মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে স্পেনের সিংহভাগ মানুষ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এল পাইস-এর পক্ষ থেকে পরিচালিত একটি ব্যাপক জনমত জরিপে এই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, স্পেনের ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ নাগরিক এই যুদ্ধের ঘোর বিরোধী হিসেবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

জরিপের বিস্তারিত ফলাফল: বিরোধিতার মাত্রা

এই ৬৮.২ শতাংশের মধ্যে ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা সরাসরি এবং স্পষ্ট ভাষায় এই সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে তাঁদের কঠোর অসম্মতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ২৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ এই সংঘাতের বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও তাঁরা কিছুটা সংযত ভাষা ব্যবহার করেছেন। বিপরীতে, মাত্র ৮ শতাংশ নাগরিক এই যুদ্ধকে সরাসরি সমর্থন করেছেন এবং ১৫ দশমিক ২ শতাংশ কিছুটা একমত পোষণ করেছেন।

সরকারের অনমনীয় নীতি: প্রধানমন্ত্রী সানচেজের যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য

স্পেনের এই জনমত এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন দেশটির সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আন্দালুসিয়ায় অবস্থিত যৌথ সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ কেবল ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতেই অস্বীকার করেননি, বরং তিনি এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।

গত বুধবার এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিয়ে ‘রাশিয়ান রুলেট’ খেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সানচেজ স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো দেশের প্রতিশোধের ভয়ে স্পেন এমন কোনো কাজে অংশ নেবে না যা বিশ্বের জন্য অমঙ্গলজনক এবং তাদের মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো চাপের মুখেই তাঁর দেশ এই যুদ্ধের অংশীদার বা সহযোগী হবে না।

কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি: ট্রাম্পের কঠোর প্রতিক্রিয়া

সানচেজের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে স্পেনের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। স্পেনের এই অসম্মতির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছেন। নিউ ইয়র্ক পোস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পেনকে ‘পরাজিত’ এবং ন্যাটোর জন্য ‘শত্রুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবের বিপক্ষে একমাত্র স্পেনই ভোট দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্পেন দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা রাখছে না এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও স্পেনের সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতামূলক আচরণ করবে না। এমনকি স্পেনের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প।

যুক্তরাজ্যের দিকেও সমালোচনা: পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ কোন্দল

ট্রাম্পের সমালোচনার তির কেবল স্পেনের দিকেই নয়, বরং যুক্তরাজ্যের দিকেও নতুন করে ধাবিত হয়েছে। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে এই সামরিক অভিযানে পর্যাপ্ত সমর্থন না দেওয়ার জন্য ‘হতাশাজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে স্পেনের বিষয়টি এখন ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেহেতু দেশটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না।

ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জনমতের এই প্রবল বিরোধিতা মধ্যপ্রাচ্য সংকটে পশ্চিমা জোটের একতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। স্পেনের সাধারণ মানুষ ও সরকার উভয়ই এই মুহূর্তে যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে স্পেনের জনমত ও সরকারের অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান