যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলা: আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও বিশ্বব্যবস্থার সংকট
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলা: আইনের লঙ্ঘন ও বিশ্ব সংকট

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলা: আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও বিশ্বব্যবস্থার সংকট

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এই ঘটনা বিশ্বকে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছে, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করতে শুরু করেছে। ইরানের শাসনব্যবস্থাকে বিপজ্জনক বা দমনমূলক হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শাসক পরিবর্তনের এই রীতি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও বৈধতা প্রশ্ন

বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্বাসযোগ্য আইনি বিশ্লেষণ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলা বেআইনি। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না, শুধুমাত্র আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকলে ব্যতিক্রম। ইরানের ক্ষেত্রে এই দুটি শর্তের কোনোটিই প্রযোজ্য নয়, কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালায়নি বা আসন্ন হুমকির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে 'আত্মরক্ষার্থে' এই হামলা বৈধ, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিবৃতিতে ইরানের নেতাকে হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। 'প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ' সমসাময়িক আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নয়, এবং ইরানের দ্বারা আগাম হুমকির কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইরানের আলঙ্কারিক বক্তব্যকে আগাম সশস্ত্র হামলার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলে আইনবিদরা মত দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খামেনির হাইব্রিড মর্যাদা ও আইনি জটিলতা

আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর পোশাকধারী সদস্য ছিলেন না, কিন্তু তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাঁর এই হাইব্রিড মর্যাদা আইনি জটিলতা তৈরি করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পার্থক্য ও আনুপাতিকতার নীতি অনুযায়ী, যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। শান্তিকালীন সময়ে বিদেশি সামরিক সদস্য বা সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করা যায় না, এবং হামলার আগে খামেনি সম্ভবত বৈধ সামরিক লক্ষ্য ছিলেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন ও যুদ্ধের বৈধতা

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রেসিডেন্টরা একতরফাভাবে সেনাবাহিনী নিয়োজিত করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে জাতীয় স্বার্থে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের যুক্তি দিচ্ছে। তবে ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনের পর বড় যুদ্ধ শুরু করতে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া সাধারণ রীতি। ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

হত্যা নিষেধাজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় দায়বোধ

১৯৭০-এর দশকে সিআইএ-এর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, কিন্তু এর সংজ্ঞা অস্পষ্ট। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় খামেনি নিহত হওয়া স্পষ্ট না হলেও, রাষ্ট্রের দায়বোধ নীতি অনুসারে উভয় দেশই আইনি দায় এড়াতে পারবে না যদি তারা জেনেশুনে আইন লঙ্ঘনে সহায়তা করে। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি যত্নশীল নয় বলে বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে, যেমন ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন ছিল।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

আক্রমণের শিকার হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করার অধিকার ইরানের থাকলেও, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ। এই ঘটনা আইনের শাসনের অবক্ষয়কে প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সুবিধামতো আইন উপেক্ষা করছে। যদি প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্র সম্ভাব্য হুমকির অজুহাতে আগাম হামলা চালাতে পারে, যা বড় সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আইন কেবল কাগজে লেখা শব্দ নয়, এটি একটি কাঠামো যা শক্তিশালী পক্ষকে সীমাবদ্ধ করে ও দুর্বলদের সুরক্ষা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা অযাচিত আগ্রাসন রোধের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছিল। আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকেও একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে, নইলে নীতির চেয়ে শক্তিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো আইনের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।