ইসরায়েল-মার্কিন অভিযানে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভাঙেনি, কৌশলগত পরিবর্তন লক্ষ্য
ইসরায়েল-মার্কিন অভিযানে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভাঙেনি

ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ অভিযানে ইরানের শাসনব্যবস্থা অটুট, কৌশলগত লক্ষ্য পরিবর্তন

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন তাদের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত শাসনব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করে তেহরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, আকস্মিক ও তীব্র হামলা—যা সামরিক পরিভাষায় ‘শক অ্যান্ড অ’ নামে পরিচিত—ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রকে অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং অভ্যন্তরীণ জনরোষ উসকে দেবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করছে।

প্রাথমিক কৌশলের ব্যর্থতা ও পাল্টা হামলা

কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং তেহরান দ্রুত পুনর্গঠন করে পাল্টা হামলা শুরু করেছে এবং সংঘাতকে আঞ্চলিক মাত্রায় ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রাথমিক কৌশল যে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একদিকে বলেছেন, এটি “অন্তহীন যুদ্ধ নয়”, অন্যদিকে স্বীকার করেছেন যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এই দ্বৈত বার্তা আসলে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দোটানাকেই প্রতিফলিত করে—দ্রুত সাফল্য দেখানোর রাজনৈতিক চাপ এবং বাস্তব সামরিক জটিলতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও এক ধাপ এগিয়ে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থেকে কিছুটা সরে এসে এখন সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

ইরানের কৌশল: সরাসরি মোকাবিলা নয়, ‘কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন’

ইরান শুরুতে বড় আকারের প্রতিশোধমূলক হামলা চালালেও পরে কৌশল বদলেছে। এখন তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি আঘাতের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়ার নীতি নিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এখানে অস্থিরতা মানেই:

  • জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি
  • বীমা খরচ বৃদ্ধি
  • সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ

ইরানের লক্ষ্য স্পষ্ট—সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ না করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করা। এতে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের জন্য সংবেদনশীল ইস্যু।

আঞ্চলিক কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা

সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব দেশ একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের অংশ, অন্যদিকে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর সঙ্গে উপসাগরীয় নেতাদের আলোচনা আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত শুধু সামরিক নয়; এটি কৌশলগত জোটের পুনর্বিন্যাসের দিকেও এগোতে পারে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার প্রশ্নে খবর এসেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি ইরানের ভেতরে বিকল্প চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত। তবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদারের কথা জানিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক ধাক্কার পর তারা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছেন।

সহ্যক্ষমতার লড়াই ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

এই যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; এটি সহ্যক্ষমতার লড়াই। কে কতদিন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করতে পারে—সেটিই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, যাতে প্রতিপক্ষের ব্যয় বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কৌশলগত ফল দেখাতে চায়, যাতে আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান অটুট থাকে।

এই সংঘাতের আরেকটি বড় মাত্রা রয়েছে চীনের ছায়া। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ব্যবহার, আঞ্চলিক ঘাঁটির ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা—সবই বৃহত্তর শক্তির নজরে রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—যদি ভবিষ্যতে চীন একই ধরনের ‘ব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার’ কৌশল গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সামাল দিতে পারবে?