মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া: উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে হুমকি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা হুমকি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সংকট

উপসাগরীয় দেশগুলো হঠাৎ করেই মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ ছুঁড়েছে আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে। এসব হামলায় শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয়, বেসামরিক অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত স্থাপনাগুলোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

অর্থনীতি ও ভাবমূর্তিতে ব্যাপক প্রভাব

ফলে, পর্যটন ও ব্যবসার জন্য নিরাপদ হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় অঞ্চলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস খাতেও প্রভাব পড়ছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান সম্ভবত আরব প্রতিবেশীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থামাতে প্রভাবিত করতে এই কৌশল নিচ্ছে।

আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ

আঞ্চলিক দেশগুলো এই সংঘাত ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সব সীমারেখা অতিক্রম হয়েছে। আমাদের সার্বভৌমত্বে হামলা চলছে। অবকাঠামো ও আবাসিক এলাকায় ক্ষতি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রতিহামলার সময় আমাদের কাছে সব বিকল্প খোলা রয়েছে। তবে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই ধরনের হামলা বিনা জবাবে থাকবে না।’

ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হলেও ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুন লেগে প্রাণহানি ঘটছে। এছাড়াও, ড্রোন হামলা বড় ধরনের ক্ষতি না করলেও ব্যবসা ও পর্যটনে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তেলের খাত যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় প্রধান বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সমপরিমাণ হামলা চালিয়েছে। এই আক্রমণ তেলের খাতকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। বড় ধরনের বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ভবিষ্যৎ কৌশল

তবে এর বিপরীতে, উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। এখন পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়নি। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে। বর্তমানে প্রধানত নিজেদের প্রতিরক্ষাতেই তারা মনোযোগী।

আঞ্চলিক ঐক্য ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা

উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাতে ইসরায়েলের পাশে থাকার কোনো ধারণা তৈরি হতে চায় না। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের হামলার জবাবে গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর আরব দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। বর্তমানে এই সংঘাত উল্টো উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য বাড়াচ্ছে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয় সদস্য— সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান জরুরি বৈঠকে নিজেদের সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে হামলার প্রতিক্রিয়াও রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিনিয়র কূটনীতিক আনোয়ার গারগাশ ইরানকে সংযমী আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আপনার যুদ্ধ আপনার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে নয়। উত্তেজনা বাড়ানোর আগে যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করুন।’