ইরানের কৌশল: সস্তা ড্রোনে যুদ্ধে অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণুতা তৈরি
ইরানের সস্তা ড্রোন কৌশলে অর্থনৈতিক যুদ্ধ

ইরানের অর্থনৈতিক যুদ্ধ: সস্তা ড্রোনে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যয়বহুল করে তোলা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘর্ষে ইরান এখন একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করছে, যার লক্ষ্য সরাসরি সামরিক আঘাতের চেয়ে আর্থিক ক্ষয়িষ্ণুতা সৃষ্টি করা। তেহরানের এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো সস্তা ডালি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এই খবর নিশ্চিত করেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে।

প্রতিশোধ ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তু

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার সর্বোচ্চ নেতা ও শত শত নাগরিক হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালালেও, সৌদি আরব ও কাতারের তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলা ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান মার্কিন মিত্রদের অর্থনৈতিক স্বার্থকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। এই কৌশলটি ইরানকে একটি বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করছে, যেখানে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা মূল উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে।

হামলার খরচের বিশাল পার্থক্য

রবিবার পর্যন্ত ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন ছুড়েছে, যার মধ্যে ৯২ শতাংশের বেশি রুখে দেওয়ার দাবি করেছে আমিরাত। স্টিমসন সেন্টারের বিশেষজ্ঞ কেলি গ্রিকো এই সাফল্যকে ‘অসাধারণ’ বললেও এর পেছনের খরচকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার হিসাবে, ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ থেকে ২০ লাখ ডলার, আর একটি শাহেদ আত্মঘাতী ড্রোনের দাম মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, আমিরাতে হামলায় ইরানের খরচ হয়েছে ১৭ থেকে ৩৬ কোটি ডলার, কিন্তু এই হামলাগুলো রুখতে আমিরাতের খরচ হয়েছে ১৪৫ থেকে ২২৮ কোটি ডলার, যা ইরানের খরচের চেয়ে প্রায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি।

ড্রোন যুদ্ধের অসমতা

ড্রোনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ গ্রিকো উল্লেখ করেন যে ইরান প্রতিটি ড্রোনের পেছনে ১ ডলার খরচ করলে, তা ভূপাতিত করতে আমিরাতের খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৮ ডলার। ইকোনমিস্ট-এর গ্রেগ কার্লস্ট্রম এই অসম যুদ্ধকে বর্ণনা করেছেন ‘ই-বাইক আটকাতে ফেরারি গাড়ি ব্যবহারের’ সঙ্গে, যা ইরানের কৌশলের কার্যকারিতা তুলে ধরে।

রাশিয়ার সফল প্রয়োগ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট

সাশ্রয়ী ড্রোন ব্যবহার করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিঃশেষ করার এই কৌশল রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে সফলভাবে প্রয়োগ করছে, যেখানে ইরানের নকশা করা শাহেদ ড্রোন এখন রাশিয়াতেই বিপুল পরিমাণে তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যেও একই সংকট তৈরি হচ্ছে, কারণ ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত মার্কিন তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সমস্যা হলো, বর্তমানে মার্কিন কারখানাগুলো যে গতিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যুদ্ধের ময়দানে তার চেয়ে বহুগুণ দ্রুতগতিতে সেগুলো খরচ হয়ে যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন হন্যে হয়ে তার প্যাট্রিয়ট, থাড ও স্ট্যান্ডার্ড মিসাইলের মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

প্রতিরক্ষা মজুতের অনিশ্চয়তা

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবচেয়ে শক্তিশালী, তাদের কাছে মার্কিন থাড ও প্যাট্রিয়ট ছাড়াও চীনের তৈরি সাইলেন্ট হান্টার লেজার সিস্টেম রয়েছে, যা সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে কার্যকর। আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের কাছেও প্যাট্রিয়ট সিস্টেম রয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো এই মজুত কতদিন টিকবে? ইতোমধ্যে খবর চাউর হয়েছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করার অনুরোধে সাড়া দিচ্ছে না ওয়াশিংটন, অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছেও অ্যারো-৩ ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

কিং’স কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞ ডেভিড জর্ডান বলেন, ‘এই যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ভর করছে কার মজুত কতটা বেশি তার ওপর। ইরান যদি নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে যেতে পারে, তবে রক্ষণভাগের দেশগুলোর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে।’ ইসরায়েল দাবি করেছে তারা ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে, যা যদি সত্য হয় তবে প্রতিরক্ষা কিছুটা সহজ হতে পারে। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শাহেদ ড্রোনের মজুত খুঁজে বের করে ধ্বংস করা মিত্রবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

শেষ পর্যন্ত, এই লড়াইয়ে শক্তির দিক দিয়ে হয়তো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে, কিন্তু সময় এবং সস্তা ড্রোনের পাহাড়সম মজুত নিয়ে ইরান খেলছে এক দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক খেলা, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।