ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতায় নতুন মাত্রা: যৌথ সামরিক অভিযানে যুদ্ধের শঙ্কা ও অর্থনৈতিক বোঝা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতায় নতুন মাত্রা: যুদ্ধের শঙ্কা ও অর্থনৈতিক বোঝা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতায় নতুন মাত্রা: যৌথ সামরিক অভিযানে যুদ্ধের শঙ্কা ও অর্থনৈতিক বোঝা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতা সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত শনিবার ইরানের অভ্যন্তরে বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কাকে জোরালো করেছে। পাল্টা হিসেবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে, ফলে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে, যা ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বোঝা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অপারেশন এপিক ফিউরি: হামলার বিস্তারিত

২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ইরানের ১,২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে ১১টি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। বিমান হামলার পাশাপাশি সাগর থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে, এবং লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নিহত ও ক্ষয়ক্ষতি

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহতদের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রয়েছেন, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন, যা মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বোঝা

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সহায়তা দিতে গিয়ে মার্কিন করদাতাদের অতিরিক্ত ৯৬৫ কোটি থেকে ১,২০৭ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, যা অঞ্চলজুড়ে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে। তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থার তথ্য মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে, এবং অভিযানের আগে প্রস্তুতিমূলক খরচ হয়েছে আরও প্রায় ৬৩ কোটি ডলার।

সামরিক সরঞ্জাম ও খরচ

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র আকাশ, সমুদ্র ও স্থলভিত্তিক অন্তত ২০টির বেশি অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • যুদ্ধবিমান: বি-১, বি-২ স্টিলথ, এফ-৩৫, এফ-১৫, এফ-১৬ ফ্যালকন।
  • ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র: এমকিউ-৯ রিপার, হিমার্স (M142), টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
  • ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা: প্যাট্রিয়ট ও থাড সিস্টেম।
  • নৌশক্তি: বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির হিসাবে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়। স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবেলের মতে, পেন্টাগন এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেনি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব নিয়ে বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ট্রাম্প জানিয়েছেন, যত দিন প্রয়োজন তত দিন অভিযান চলবে, তবে প্রাথমিকভাবে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ব্যয় কয়েকগুণ বাড়তে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও দেশ এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।