ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে তিনটি নতুন অস্ত্রব্যবস্থার ব্যবহার
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। টানা ৭২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লড়াই চলার পর, অভিযানে ব্যবহৃত কিছু অস্ত্রব্যবস্থা বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য ও ভিডিওচিত্র এখন পাওয়া যাচ্ছে। এই অভিযান একাধিক দিক থেকে প্রথমবারের মতো সাক্ষী হয়ে আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অন্তত তিনটি নতুন অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করেছে।
পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রের আত্মপ্রকাশ
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মরুভূমির কোনো এক স্থানে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি এম–১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স) থেকে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে একটি প্রিসিশন-স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সেন্টকম জানায়নি, হিমার্স থেকে ঠিক কোন ধরনের গোলাবারুদ ছোড়া হয়েছে, তবে ভিডিওতে স্পষ্টভাবে পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র দেখা যায়।
ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই অস্ত্রটির গঠন ও বৈশিষ্ট্য এমজিএম–১৪০ এটিএসিএমএস–এর তুলনায় স্পষ্টত ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ প্রকল্পের ফল পিআরএসএম, যা এমজিএম–১৪০ এটিএসিএমএস–এর বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। ২০২৩ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী, এর পাল্লা প্রায় ২৫০ মাইল এবং এটি ২০০ পাউন্ড ওজনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। এম–১৪২ হিমার্স ছাড়াও এম–২৭০ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম থেকেও পিআরএসএম নিক্ষেপ করা যায়। পিআরএসএম-এর পাল্লা অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় কম হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে এটি ব্যবহার করা হয়েছে।
লুকাস ড্রোন: ইরানি ড্রোনের অনুলিপি
অপারেশন এপিক ফিউরিতে আত্মপ্রকাশ করেছে আরেকটি অস্ত্রব্যবস্থা—লুকাস (LUCAS)। এটি একমুখী আক্রমণাত্মক মানববিহীন আকাশযান, যাতে বিস্ফোরক ওয়ারহেড রয়েছে। লুকাস ড্রোনটি মূলত ইরানের শাহেদ-ধাঁচের লয়টারিং মিউনিশনের প্রতিরূপ, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কয়েক মাস আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী টাস্ক ফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক গঠন করে, যাতে সংশ্লিষ্ট কমান্ডকে একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন সক্ষমতা দেওয়া যায়। সেন্টকম এক্সে লিখেছে, ‘সেন্টকমের টাস্ক ফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক—ইতিহাসে প্রথমবারের মতো—অপারেশন এপিক ফিউরির সময় যুদ্ধে একমুখী আক্রমণ ড্রোন ব্যবহার করছে। ইরানের শাহেদ ড্রোনের আদলে তৈরি এই স্বল্পমূল্যের ড্রোনগুলো এখন মার্কিন নির্মিত প্রতিশোধ বহন করছে।’
চলমান সংঘাতে এবং বৃহৎ আকারের যুদ্ধ পরিচালনায় লুকাসে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ব্যয়-সাশ্রয়ী অবস্থা। ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতোই একেকটি লুকাস ড্রোনের দাম প্রায় ৩৫ হাজার ডলার, ফলে এটি কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী বিকল্প। অবশ্য এই ড্রোনের নিখুঁততা, গতি, গোপন সক্ষমতা ও ধ্বংসক্ষমতা উন্নততর ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নয়, তবে বৃহৎ পরিসরের যুদ্ধে এটি কার্যকর হাতিয়ার। কামিকাজে ধাঁচের এই ড্রোন স্থল ও নৌ—উভয় বাহিনী থেকেই নিক্ষেপ করা যায়।
স্টেলথ টমাহক মিসাইলের ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সম্ভবত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি নতুন, স্টেলথ সংস্করণ ব্যবহার করেছে। নৌবাহিনীর প্রকাশিত ভিডিওতে একটি কালো রঙের টমাহক ক্রুজ মিসাইল দেখা যায়, যেখানে সাধারণত টমাহক ধূসর রঙের হয়। কালো রঙটি সম্ভবত লো-অবজারভেবল প্রলেপ, যা শত্রুর রাডার শোষণ করে এবং ক্ষেপণাস্ত্রের টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ায়।
আরজিএম–১০৯ টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল (টিএলএএম) এক ধরনের ক্রুজ মিসাইল, যা সাবমেরিন ও পৃষ্ঠজাহাজ—উভয় প্ল্যাটফর্ম থেকেই নিক্ষেপ করা যায়। টমাহকের বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে, যেগুলোর কার্যকর পাল্লা সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত। অভিযানের শুরুর দিকের কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, একাধিক টমাহক ঘণ্টায় ৫০০ মাইলের বেশি গতিতে ভূমি থেকে প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতায় উড়ে যাচ্ছে, যাতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নজর এড়ানো যায়। টমাহক ১,০০০ পাউন্ড ওজনের ইউনিটারি ও ফ্র্যাগমেন্টেশন ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম।
এই নতুন অস্ত্রব্যবস্থাগুলোর ব্যবহার অপারেশন এপিক ফিউরিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করছে, যা ভবিষ্যতের যুদ্ধ কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে।



