ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক বা ইন্টারসেপ্টর মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনে ইরানের শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে গিয়ে মার্কিন বাহিনীর অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
ইরানের পাল্টা হামলা ও মার্কিন প্রতিরক্ষা
সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও বাহিনী মোতায়েনকৃত দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে পাল্টা হামলা চালায়। এই হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ব্যাপকভাবে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে।
শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন সোমবার জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী তাদের অংশীদার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। তবে এই সফলতার পেছনে রয়েছে অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টরের ব্যবহার, যার মজুত সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেলি গ্রিয়েকো সতর্ক করে বলেন, 'ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।' তিনি উল্লেখ করেন, সংঘাতের শুরুতে ইসরাইলের ধারণা ছিল ইরানের কাছে প্রায় ২,৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত প্রতিরোধক সংখ্যার চেয়ে বেশি।
গ্রিয়েকোর মতে, 'এটি একটি প্রতিযোগিতা—ইরানের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাল্টা হামলা।' উভয় পক্ষই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও গুদামগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি ও উৎপাদন সমস্যা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারসেপ্টরের ক্ষেত্রে উৎপাদন কোনোভাবেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। গ্রিয়েকো জানান, 'ইউরোপ, ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য—প্রতিটি অঞ্চলে আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা লঞ্চার ও ইন্টারসেপ্টরের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এগুলো যত দ্রুত ব্যবহার করছে, তত দ্রুত প্রতিস্থাপন করতে পারছে না।'
ড্রোন মোকাবিলায়ও ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার হচ্ছে, তবে ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় কম পরিমাণে। সবচেয়ে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে ব্যালিস্টিক ইন্টারসেপ্টরে। যুদ্ধ কতদিন চলবে, সেটিও ইন্টারসেপ্টরের চাহিদা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন
মার্কিন কর্মকর্তারা বহু-সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, 'শুরুতে আমরা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, কিন্তু এর চেয়েও দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে।'
পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথ সম্ভাব্য বিভিন্ন সময়সীমার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, 'চার সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, ছয় সপ্তাহ—সময় বাড়তেও পারে, কমতেও পারে।'
বৈশ্বিক প্রভাবের আশঙ্কা
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক জো কোস্টা সতর্ক করে বলেন, 'ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চীনসহ অন্যান্য বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মজুতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।'
জেনারেল কেইন ইরানের ড্রোন হুমকির কথা স্বীকার করেছেন, তবে ভূপাতিত ড্রোনের সঠিক সংখ্যা জানাননি। তিনি শুধু বলেছেন, 'আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ধ্বংস করতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।'
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মজুতের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকবে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
