মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা: খামেনি হত্যার পর ইরানের পালটা হামলা ও বৈশ্বিক সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি নিহত হওয়ার পর, তেহরানের পালটা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের মধ্যে পড়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের লক্ষ্য হলো ইরানে নিজেদের অনুকূলে শাসন পরিবর্তন ঘটানো। তাদের এই লক্ষ্য সফল হলে এর প্রভাব শুধু ইরান নয়, বরং গোটা অঞ্চল এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও গভীর ফলাফল বয়ে আনবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
খামেনির মৃত্যু ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্থিতিশীলতা
খামেনির মৃত্যু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও তেহরান এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে—সেই সক্ষমতা তাদের আছে। অতীতে বহু প্রভাবশালী ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন কাসেম সোলাইমানির মতো নেতা, যিনি ইরানের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকৌশলের স্থপতি হিসেবে সুপরিচিত। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিনি নিহত হন। তবে এসব হতাহতের পরও তুলনামূলক দ্রুত বিকল্প নেতৃত্ব উঠে এসেছে এবং ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকেও গেছে। অর্থাৎ, স্বল্প মেয়াদে খামেনির অনুপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ডেকে আনবে—এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সম্ভাব্য এই পরিস্থিতি তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন এবং তিনি 'শহিদ' হলে নেতৃত্বের উত্তরাধিকার কেমন হবে, সে বিষয়ে ব্যবস্থাও নিয়ে গেছেন বলে জানা যায়।
খামেনি শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, আধ্যাত্মিক নেতাও ছিলেন। ইরানের ধর্মপ্রাণ শিয়া জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি আঞ্চলিক বহু মুসলমানের ওপরও তার প্রভাব রয়েছে। ফলে তার হত্যাকাণ্ড প্রতিশোধপরায়ণ চরমপন্থি সহিংসতার নতুন ঢেউ সৃষ্টি করলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
টিকে থাকার প্রশ্নে ‘গড়ে তোলা শাসনব্যবস্থা'
খামেনির মৃত্যুর পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ ও অপসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' এখন বৈঠকে বসবে এবং অন্তর্বর্তী বা স্থায়ী নেতা নিয়োগ করবে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তারা হলেন:
- বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি
- খামেনির চিফ অব স্টাফ আলি আসগর হেজাজি
- হাসান খোমেনি, যিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহাল্লা খামেনির নাতি
এই শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। দেশ জুড়ে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং তাদের অধীনস্থ আধাসামরিক বাহিনী সক্রিয় রয়েছে, যারা যে কোনো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং শাসনব্যবস্থা রক্ষায় সদাসর্বদা প্রস্তুত। তাদের স্বার্থ শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একইভাবে সরকারি প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশ এবং এমনকি সাধারণ জনগণের একাংশও ধর্মীয় আদর্শ ও জাতীয়তাবাদের মিশেলে এই ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আসছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের জনগণ—যাদের প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে, তাদেরকে শাসনব্যবস্থা উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং ’২৬ সালের শুরুতে অর্থনৈতিক সংকট ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল, যা কঠোরভাবে দমন করা হয়। ট্রাম্প এখন সেই বিক্ষোভকারীদের আবারও মাঠে নামাতে উসকানি দিচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চিত। যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো— বিশেষত আইআরজিসির ভেতরে ফাটল না ধরছে, ততক্ষণ শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর দ্রুত পালটা জবাব দিয়েছে ইরান। পারস্য উপসাগর জুড়ে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে স্বল্প ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। অনেক হামলা প্রতিহত হলেও বেশ কিছু হামলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং এতে বেশ ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করারও ঘোষণা দিয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশ তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটি খোলা রাখার অঙ্গীকার করেছে বটে। তবে তা সম্ভব হবে কি না, সেটাই বিবেচ্য। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। অর্থাৎ, সার্বিক চিত্র বলছে, উভয় পক্ষই পূর্বের সব ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছে। এখন তারা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত, যার প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা
ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম যদি মনে করে থাকে যে, তাদের হামলা কোনো নতুন আঞ্চলিক যুদ্ধ ডেকে আনবে না, তাহলে সেটি হবে একটি ভুল হিসাব। কারণ, এরই মধ্যে সংঘাত বিস্তৃত হতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির মতো দেশগুলো ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার—তথা চীন ও রাশিয়া, ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। উপরন্তু, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও কূটনৈতিক সমাধানে চলমান যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দ্বিতীয় দফা আলোচনা চলছিল। মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক দিন আগেই বলেছিলেন যে, শান্তি ‘হাতের নাগালে’; কিন্তু সেই কথায় কান দেননি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। বরং তাদের লক্ষ্য ছিল, শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং ইরানের সামরিক সক্ষমতাও দুর্বল করে দেওয়া। এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সংঘাত কয়েক দিন নয়, বরং কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শাসন পরিবর্তন ছাড়া অন্য কিছুতে সম্ভবত রাজি হবে না। অন্যদিকে, ইরানও অস্তিত্বের প্রশ্নে মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে।
এই যুদ্ধের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রতিপক্ষ—বিশেষ করে চীনের প্রতি, একটি বার্তাও দিচ্ছে। তাদের বার্তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক শক্তির শীর্ষে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। এই ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষকে এবং একই সঙ্গে এই অঞ্চলসহ গোটা বিশ্বকে। আরেকটি ‘পছন্দের যুদ্ধ' শুরু হলে বিশ্বকে তার পরিণতি বহন করতে হবে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব আগে থেকেই একাধিক যুদ্ধের অভিঘাতে এক কঠিন ও গভীর সংকটে ধুঁকছে।
