মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় জ্বালানি সংকট: তেল-গ্যাস উৎপাদন বন্ধ, বিশ্ববাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী
ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস উৎপাদন বন্ধ, দাম বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি সংলগ্ন জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তেহরানের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ বেশ কিছু দেশের তেল শোধনাগার ও গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলারে ঠেকেছে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সৌদি আরব ও কাতারে উৎপাদন বন্ধ

সোমবার (২ মার্চ) থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগার ‘রাস তানুরা রিফাইনারি’ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল উৎপাদনক্ষমতার এই স্থাপনাটিতে হামলার পর কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই দিনে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে ড্রোন আঘাত হানার পর উৎপাদন স্থগিত করেছে। উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ করে কাতার।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরায়েলের মতো উন্নত না হওয়ায় ইরান সেগুলোকে সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক রব গেইস্ট পিনফোল্ড জানান, এই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে আগ্রহী না হলেও তাদের মাটিতে মার্কিন ঘাঁটি থাকায় তারা ইরানের রোষানলে পড়েছে। এদিকে কুয়েতের আহমাদি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলায় দুজন কর্মী আহত হয়েছেন এবং ইরাকের কুর্দিস্তান ও ইসরায়েলের বেশ কিছু গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য সংকট

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইয়োর্গে লেওন সতর্ক করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এই পথ বন্ধ থাকলে কেবল তেলের দামই নয়, বরং খাদ্য ও নিত্যপণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল দুবাই, দোহা ও কুয়েতের মতো শহরগুলোতে হাহাকার তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল ইসরায়েলকে রক্ষায় নিয়োজিত করেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের হামলার মুখে এক প্রকার অরক্ষিত অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাচা ব্রুচমান মনে করেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই ইরান পরিকল্পিতভাবে এই অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলোকে নিশানা করছে।

এই হামলার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সূত্র: রয়টার্স