ইরানে নেতৃত্বশূন্যতা: আলীরেজা আরাফিই কি হচ্ছেন পরবর্তী খামেনি?
ইরানে নেতৃত্বশূন্যতা: আরাফিই কি পরবর্তী খামেনি?

ইরানে নেতৃত্বশূন্যতা: আলীরেজা আরাফিই কি হচ্ছেন পরবর্তী খামেনি?

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটিতে এক বিশাল নেতৃত্বশূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করেছে তেহরান সরকার।

অন্তর্বর্তী কাউন্সিলের গঠন ও দায়িত্ব

এই কাউন্সিলে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ও প্রখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ আলীরেজা আরাফি স্থান পেয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই তিন জনের মধ্য থেকে শিগগিরই একজনকে শীর্ষ নেতা নির্বাচন করা হবে।

শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হামলার পর থেকে ইরানে মূলত কোনো একক নেতৃত্ব নেই। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করার নির্দেশনা কে দেবেন- এই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জেনারেলরা এখন তাদের ইচ্ছেমতো প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন, কারও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই।

আলীরেজা আরাফি: খামেনির বিশ্বস্ত সহযোগী

অন্তর্বর্তী কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য আলীরেজা আরাফি নিহত সর্বোচ্চ নেতা খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তার প্রাথমিক জীবন ও উত্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সূত্রে।

অলাভজনক সংস্থা 'মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালে ইরানের কেন্দ্রীয় ইয়াজদ প্রদেশের মেয়বোদ শহরের এক ধর্মীয় পরিবারে তার জন্ম। ইরানে প্রচলিত বিশ্বাস মতে, আরাফি পরিবার মূলত ১৯০০ শতাব্দীতে ইসলাম গ্রহণকারী পার্সি (জোরোস্ট্রিয়ান) বংশোদ্ভূত।

আরাফির শিক্ষা ও কর্মজীবন:

  • মাত্র ১১ বছর বয়সে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পবিত্র শহর কোমে চলে যান
  • তৎকালীন পশ্চিমাপন্থী শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরোধিতার কারণে ১৬ বছর বয়সে কারাবরণ করেন
  • ১৯৯২ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে মেয়বোদ শহরের জুমার নামাজের ইমাম নিযুক্ত হন
  • ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোমের আল-মুস্তফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
  • ২০১৯ সালের জুলাইয়ে খামেনি তাকে প্রভাবশালী ১২ সদস্যের 'গার্ডিয়ান কাউন্সিল'-এ নিযুক্ত করেন
  • বর্তমানে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন

পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আরাফির সম্ভাবনা

৬৭ বছর বয়সী এই আলেম আরবি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং তার বেশ কিছু বই ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কাউন্সিলের তিন সদস্যের মধ্যে আরাফি সবচেয়ে তরুণ। রোববার তিনি এক বিবৃতিতে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, জাতি বিপ্লবের পথেই চলবে এবং জনগণ, প্রিয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের রক্তের প্রতিশোধ নেবে।

পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার নামের পাশাপাশি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইর নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, কিছু অসমর্থিত খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় আরাফি নিহত হয়েছেন।

সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে দাবি করেছেন যে, 'ইরানের ভারপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আরাফি তেহরানে নতুন হামলায় নিহত হয়েছেন।' তবে এই খবর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি এবং ইরান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

১৯৮৯ সালে খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পরই আরাফির রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। এর আগে ধর্মীয় মহলের বাইরে তিনি তেমন পরিচিত ছিলেন না। তবে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু আরাফিকে বিশ্বজুড়ে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে এবং তাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও গুঞ্জন।

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত। নেতৃত্বশূন্যতা, যুদ্ধের ধারাবাহিকতা এবং অন্তর্বর্তী কাউন্সিলের কার্যকারিতা- এই সবকিছুই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। আলীরেজা আরাফিই কি পরবর্তী খামেনি হবেন, নাকি অন্য কেউ এই দায়িত্ব পালন করবেন- সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।