ইরানের ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর 'নিরাপদ' ভাবমূর্তি ধ্বংস, বহুতল ভবনে আগুন
ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপদ ভাবমূর্তি ধ্বংস

ইরানের ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড: স্থিতিশীলতার চিত্র ভেঙে পড়েছে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি বহুতল ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত এই হামলা শুধু কাচ ও কংক্রিটের দেয়ালই ভাঙেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সামনে যে স্থিতিশীলতার চিত্র তৈরি করেছিল, তা মুহূর্তেই ধ্বংস করেছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংকট থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে চাইলেও এখন তারা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি।

হামলার বিস্তারিত ও ক্ষয়ক্ষতি

গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। শনিবার সন্ধ্যার হামলায় আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত ও ৫৮ জন আহত হন। ক্ষেপণাস্ত্র বা তাদের ধ্বংসাবশেষ দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দরে আঘাত হানে। দোহায়ও ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।

সৌদি আরব জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলেও আঘাত হেনেছে। কাতারে ১৬ জন, ওমানে ৫ জন, কুয়েতে ৩২ জন এবং বাহরাইনে ৪ জন আহত হয়েছেন। ইরানে একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ১৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিশু।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শান্তি আলোচনা ব্যর্থ ও নতুন যুদ্ধ মডেল

উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ চায়নি। হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ওমানের উদ্যোগে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল–বুসাইদি শান্তি ‘হাতের নাগালে’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোনিকা মার্কস বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো মাস না হলেও কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ এগিয়ে আসতে দেখেছিল এবং থামানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিংস কলেজ লন্ডনের লেকচারার রব গাইস্ট পিনফোল্ড বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি নতুন মডেল দেখতে যাচ্ছে, যা রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের পুরোনো মডেলের পুনরাবির্ভাব। তিনি বলেন, ‘আমরা আগে যতটা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো বা প্রক্সি যুদ্ধ দেখতাম, এখন তা আর দেখা যাচ্ছে না। এর পরিবর্তে আমরা নতুন মাত্রার উত্তেজনা ও সংঘাতের বৃদ্ধি দেখছি।’

অবকাঠামোগত হুমকি ও কৌশলগত পুনঃসমন্বয়

মার্কসের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের তাত্ক্ষণিক ভয় তাদের সবচেয়ে দুর্বল অবকাঠামো নিয়ে, যেমন বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি পরিশোধন প্ল্যান্ট ও জ্বালানি অবকাঠামো। এসবের ওপর আঘাত দেশগুলোর জন্য দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও পানীয় জল পরিশোধনব্যবস্থা ছাড়া প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার উপসাগরীয় দেশগুলো বসবাসের অযোগ্য। জ্বালানি অবকাঠামো ছাড়া তারা অচল হয়ে পড়বে।’

আগের পর্যবেক্ষণ থেকে মার্কসের ধারণা ছিল, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের চেয়ে ইসরায়েলকে বড় হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল, বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার পর। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরান বিস্তৃত কিন্তু এলোমোলো আঘাত হেনেছে এবং সবচেয়ে ভয়ংকর আঘাত এখনো আসতে বাকি।

এই মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত নিজেদের কৌশল পুনঃসমন্বয় করছে। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে ইরানের কর্মকাণ্ডের ওপর। একটি বিকল্প হতে পারে এ যুদ্ধে নিজেদের না জড়ানো, যা উপসাগরীয় দেশগুলো চাইছে। কিন্তু তাদের ঝলমলে আকাশছোঁয়া ভবনগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ায় এই বিকল্প দ্রুত হাতছাড়া হতে শুরু করেছে।