যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ: কারা ছিলেন তারা?
ইরানে হামলায় নিহত শীর্ষ নেতাদের পরিচয়

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ: কারা ছিলেন তারা?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত হামলায় শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হয়েছেন। রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এই হামলায় খামেনির মেয়ে, জামাতা এবং নাতিও নিহত হয়েছেন।

ইরানের প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান খামেনির এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকাশ্য ঘোষণা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান শাসন করা এই নেতার মৃত্যুতে শোকবার্তায় পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এই বিয়োগান্তক ঘটনাটি বর্তমান ইসলামি বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।’

নিহত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তালিকা

ইরনা খামেনি ছাড়াও আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তারা হলেন:

  • আলী শামখানি: ইরানের নবগঠিত ‘প্রতিরক্ষা কাউন্সিল’-এর সচিব এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। ৭০ বছর বয়সি এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার তদারকি করতেন। গত বৃহস্পতিবারও তিনি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলা ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও শামখানি ইসরাইলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন, কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন।
  • আবদুর রহিম মুসাভি: ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ। গত বছর জুনে ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলার মাত্র কয়েকদিন পরেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। জেনারেল মুসাভিকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, উন্নত ড্রোন সিস্টেম এবং মহাকাশ গবেষণার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও কারিগর মনে করা হয়। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে মুসাভির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে।
  • আজিজ নাসিরজাদেহ: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলার মুখে ইরানের সামরিক, বিশেষ করে পারমাণবিক অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে নাসিরজাদেহ মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের চরম সমালোচক ছিলেন।
  • মোহাম্মদ পাকপুর: আইআরজিসি'র অভিজ্ঞ সমরনায়ক ও শীর্ষ কমান্ডার, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত ইরানের অভিজাত বাহিনী ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর প্রধান কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার মৃত্যু আইআরজিসি-র জন্য এক বিশাল ক্ষতি, কারণ তিনি মাঠ পর্যায়ের যুদ্ধ এবং কৌশলগত পরিকল্পনা উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ ছিলেন।

পরবর্তী উত্তরসূরি নির্বাচন

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অস্থায়ীভাবে একটি তিন সদস্যের কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এই কাউন্সিলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং অভিভাবক পরিষদের একজন প্রতিনিধি। অভিভাবক পরিষদের ধর্মীয় নেতা আলীরেজা আরাফিকে নেতৃত্ব পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক মাজিয়ার মোতামেদী জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আইআরজিসি এবং নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজনী অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করবেন। আইআরজিসি'র পরবর্তী প্রধান হিসেবে খামেনির দুই মাস আগে নিয়োগ দেওয়া উপ-প্রধান আহমদ ওয়াহিদির নাম শোনা যাচ্ছে।