ইরান যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা: কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন
দোহার গ্লাসঘেরা আকাশচুম্বী ভবন থেকে শুরু করে দুবাই ও মানামার সুউচ্চ অট্টালিকা—ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধুলোয় মিশে গেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর বহুদিনের সযত্নে গড়া ‘স্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি’। কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে নিজেদের নিরাপদ ও বিচ্ছিন্ন রাখার যে নীতি তারা অনুসরণ করে আসছিল, সপ্তাহান্তের এই হামলা তা চুরমার করে দিয়েছে। এখন কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলো এক অসম্ভব কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। তারা কি এই হামলার পাল্টায় যুদ্ধে নামবে নাকি নিজের শহরগুলো পুড়তে দেখেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে, তা এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হামলার প্রভাব: ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি উপসাগরীয় অঞ্চল
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান যে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তার আঁচ সরাসরি এসে লেগেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। দোহার আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী, দুবাই বিমানবন্দর ও মানামার সুউচ্চ ভবনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এবং কুয়েত ও রিয়াদের ওপর চালানো ড্রোন হামলা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এক ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুবাই বা দোহার ওপর এই হামলা মার্কিনিদের কাছে মায়ামি বা সিয়াটলে বোমা পড়ার মতোই অকল্পনীয় ও স্তম্ভিত করার মতো বিষয়।
যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি: অভ্যন্তরীণ বৈধতা ও ভাবমূর্তি সংকট
উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ কখনোই চায়নি। এমনকি হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও ওমান ও ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর কাছাকাছি ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আচমকা হামলা সব সমীকরণ পালটে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন তারা পরাজয় মেনে নেওয়ার চেয়ে বরং প্রতিবেশী দেশগুলোকে জিম্মি করে ‘ভ্রাতৃঘাতী’ সংঘাতকেই বেছে নেয়। এখন এই রাষ্ট্রগুলো যদি পাল্টা আক্রমণে যায়, তবে তাদের ওপর ইসরাইলের সহযোগী হওয়ার তকমা লাগার ঝুঁকি থাকে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ বৈধতাকে সংকটে ফেলতে পারে।
বর্তমানে এই দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি কেবল বাহ্যিক হামলা নয়, বরং তাদের অর্জিত ‘সফট পাওয়ার’ বা ইমেজ রক্ষা করা। পর্যটন ও বিনিয়োগের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যে নিরাপদ স্বর্গ হিসেবে তারা পরিচিত ছিল, সেই ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্ল্যান্টগুলো যদি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়, তবে প্রচণ্ড গরমের এই মরু অঞ্চলগুলো মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
সম্ভাব্য পদক্ষেপ: জিসিসি নেতৃত্বে সামরিক শক্তি ব্যবহার
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো হয়তো সরাসরি ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ না দিয়ে নিজস্ব সম্মিলিত সামরিক শক্তি ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’ বা জিসিসি-র একক নেতৃত্বে কোনো পদক্ষেপে যেতে পারে। এটি তাদের নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিকে জোরালো করবে এবং একই সঙ্গে তারা কেবল পশ্চিমা শক্তির অনুসারী নয়—এমন বার্তাও দেবে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধে জড়াবে কিনা, তা নির্ভর করবে তেহরান আগামী দিনগুলোতে আর কোনো আলোচনার পথ খোলা রাখে কিনা তার ওপর।
সূত্র: আলজাজিরা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা ঘটনাপ্রবাহ: ইরান-ইসরাইল সংঘাত।
