ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি হত্যাকাণ্ড: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত, উত্তেজনা তুঙ্গে
ইরানে খামেনি হত্যাকাণ্ড: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা, উত্তেজনা তুঙ্গে

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি হত্যাকাণ্ড: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় উত্তেজনা তুঙ্গে

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় নিহত হয়েছেন। ৩৬ বছর ধরে দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। হামলায় ইরানের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তাও প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদুল রহিম মৌসাভি।

হামলার বিস্তারিত ও প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি

গত রোববার মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের দ্বিতীয় দিনে এই হামলা চালানো হয়। প্রথম দিনে তেহরানে খামেনির বাসভবন ও কার্যালয়ে আকাশপথে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হামলায় খামেনির মেয়ে, জামাতা ও নাতিও নিহত হয়েছেন।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঘোষণা দিয়েছেন যে সশস্ত্র বাহিনী কঠোর আঘাত হানতে থাকবে এবং শত্রুদের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করতে থাকবে। ইরানে ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা হামলা ও হতাহত

গতকাল ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ষষ্ঠ দফায় হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। হামলায় জেরুজালেমের ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় ৯ জন নিহত ও প্রায় ৫১ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলে তেল আবিব ছাড়াও দখলকৃত পশ্চিম তীর ও হাইফা শহরে সতর্কসংকেত হিসেবে সাইরেন শোনা যায়।

ইরানের হামলায় ইরাকে দুজন, আরব আমিরাত ও কুয়েতে একজন করে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইরাকে ৫ জন, কুয়েতে ৩২ জন, বাহরাইনে ৪ জন, আরব আমিরাতে ৫৮ জন ও ওমানে ৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার কাতারের দিকে এগোতে থাকা একটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করেছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান।

নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ও আলোচনার সম্ভাবনা

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আপাতত দায়িত্ব পালন করবে ইরানের ‘লিডারশিপ কাউন্সিল’। এই কাউন্সিলের সদস্য হলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি মোহসেনি এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ধর্মীয় নেতা আলী রেজা আরাফি। দু-এক দিনের মধ্যে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় এবং তিনি এতে রাজি হয়েছেন। যদিও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খামেনি হত্যার পর ইরান আর আলোচনায় বসবে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

খামেনি হত্যার ঘটনাকে ‘নিষ্ঠুর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর অস্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেছেন। খামেনির মৃত্যুতে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে ইরাক।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। গত বছর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যে সংঘাত হয়েছিল, তার চেয়ে এবারের সংঘাতের পরিধি ব্যাপক। তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং এমন হামলা আরও কয়েক দিন ধরে চলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিজ ভূখণ্ডে ইরানের হামলার জবাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কীভাবে দেবে, তা–ও পরিষ্কার নয়।