দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ হোটেলে হামলা: ইরানের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রে আতঙ্ক, নিহত-আহত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বিখ্যাত পাম জুমেইরাহ এলাকায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সংঘটিত এই হামলায় এখন পর্যন্ত তিন জন নিহত ও অন্তত বারো জন আহত হয়েছেন। হামলার পর হোটেল থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
শান্তিপূর্ণ সকাল থেকে হঠাৎ আক্রমণ
শনিবার সকালে দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ এলাকার সৈকত ও ক্লাবগুলো লোকারণ্য ছিল। দৌড়বিদরা সমুদ্রতীরে ওয়ার্ম আপ করছিলেন, বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ভিড় ছিল স্বাভাবিক। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিতে শহরটি ছিমছাম ও শান্তিপূর্ণ দেখালেও, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসতে শুরু করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও বাহরাইনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাতের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ‘ইন্টারসেপ্টর’ উড়তে দেখা যায়। তবে অনেক পর্যটক জানান, তাঁরা এ হামলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কোনো সতর্কসংকেত বা এয়ার রেইড সাইরেন বাজানো হয়নি। স্থানীয় ফোন নম্বর ব্যবহারকারীরা সরকারি সতর্কতাবার্তা পেলেও, বিদেশি পর্যটকরা শুরুতে বুঝতে পারেননি ঘটনাটির গুরুত্ব।
পর্যটকদের আতঙ্ক ও হোটেলের জরুরি ব্যবস্থা
নাতালিয়া ভেরেমেনকো নামের এক পর্যটক পাম জুমেইরাহর ‘ফেয়ারমন্ট দ্য পাম’ রিসোর্টের কাছে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, আতশবাজি ফুটছে।’ ড্রোন হামলায় রিসোর্টটির প্রবেশদ্বারে আগুন ধরে যায়। নাতালিয়া প্রথমে ভেবেছিলেন এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তাগুলো আবার লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে আগুনের খবর পাওয়া যায়। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সেখানে ঘন ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর এলাকা থেকেও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়, যা বিশ্বের নবম ব্যস্ততম বন্দর। এমনকি দুবাইয়ের আইকনিক স্থাপনা বুর্জ আল আরব হোটেলেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগে।
হামলার পর অনেক বিলাসবহুল হোটেল তাদের অতিথিদের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ ও বারান্দা থেকে সরিয়ে নেয়। হোটেলের ভূগর্ভস্থ পার্কিং ও সার্ভিস করিডরে নিয়ে যাওয়া হয়। এক রুশ লাইফস্টাইল ব্লগার হোটেলের ভূগর্ভ থেকে সিল্কের পাজামা পরা নিজের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, ‘জরুরি অবস্থা, তবে তাতেও থাকুক ফ্যাশনের ছোঁয়া।’
নিরাপত্তা প্রশ্ন ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
দুবাইয়ের বাসিন্দাদের বড় অংশ বিদেশি নাগরিক, যাঁরা নিরাপত্তা ও করছাড়ের সুবিধার আশায় শহরে বসবাস করেন। এই হামলায় শহরের নিরাপত্তা বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রাতের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে বুর্জ খলিফায় হামলা হয়েছে এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
সকাল হতেই কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বাসিন্দা ও পর্যটকদের আশ্বস্ত করে জানানো হয়, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। বিমানে যাতায়াতে সমস্যায় পড়া যাত্রীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মাঝআকাশে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
আমিরাতের বিশ্লেষক আমজাদ তাহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, ‘আপনারা এখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত শতভাগ নিরাপদ। জীবন ও ব্যবসা আগের মতোই স্বাভাবিক চলবে।’ তবে এই হামলা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ দেশের সুনামে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
