যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে দুই শতাধিক নিহত, উত্তেজনা ছড়ালো বিশ্বে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে দুই শতাধিক নিহত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে দুই শতাধিক নিহত, উত্তেজনা ছড়ালো বিশ্বে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সামরিক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা আলোচনার মধ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্পের হুমকি এবং আট মাস আগের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান আবারও বড় ধরনের হামলার শিকার হয়েছে।

ইরানে কী ঘটেছে?

ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির খবর অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে রাজধানী তেহরানে ধারাবাহিকভাবে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তেহরানে দায়িত্বরত আল-জাজিরার প্রতিনিধি দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শহরের বিভিন্ন অংশ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। ইসরায়েল প্রথম জানায় তারা ইরানের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে এই অঞ্চলে বড় আকারে যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে ওয়াশিংটন। ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি।

ইরানের কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে?

তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট ও জমহুরি এলাকায় বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদর দপ্তরের কাছেও হামলা হয়েছে। রাজধানী তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দপ্তর ও বাসভবনের চত্বরেও হামলা হয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের উত্তরের সৈয়দ খন্দান এলাকায়ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরানের বাইরে কেরমানশাহ, কোম, তাবরিজ, ইস্পাহান, ইলাম ও কারাজ শহরেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া লোরেস্তান প্রদেশেও হামলা হয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য ও অভিযানের লক্ষ্য

‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ ঘোষণার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া এই অভিযানের লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের নৌবাহিনী নির্মূল করতে যাচ্ছি।’ ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল কথা—যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে, যা ‘বিশাল ও চলমান’। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান সরকারের দিক থেকে আসা ‘আসন্ন হুমকি’ মোকাবিলাই মূল লক্ষ্য। ট্রাম্প এই অভিযানের সামরিক উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন এভাবে—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। ইরানের নৌবাহিনীকে নিশানা করা। এ অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ছত্রভঙ্গ করা। ইরান যেন কোনোভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। ট্রাম্প ইরানের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য একই সঙ্গে সতর্কতা ও প্রস্তাব দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, তাঁরা অস্ত্র সমর্পণ করলে দায়মুক্তি পাবেন। কিন্তু তা না করলে তাঁদের ‘নিশ্চিত মৃত্যু’র মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন বাহিনীতেও হতাহত হতে পারে বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশোধমূলক হামলা

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরান প্রথমে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হামলার জবাব দিয়েছে। দেশটির বেশ কিছু অংশে সাইরেন বেজে ওঠে এবং উত্তর ইসরায়েলে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জনসাধারণকে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী হুমকি মোকাবিলায় বাধা প্রদান ও সেগুলোতে আঘাতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’ প্রাথমিক জবাবের পরপরই ইরানি বাহিনী পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর আগে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি ‘চরম’ জবাব দেওয়ার হুমকি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা আপনাদের সতর্ক করেছিলাম! এখন আপনারা এমন এক পথ বেছে নিয়েছেন, যার পরিণতি আর আপনাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাঈদি বলেন, তাঁর দেশের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সক্রিয় ও গুরুতর আলোচনা এ উত্তেজনার কারণে ‘আবারও বাধাগ্রস্ত’ হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানান। ইরানের হামলাকে নিজেদের ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। দেশটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাকিস্তানের একজন নাগরিক নিহত হয়েছেন। দেশটি এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সার্বভৌমত্বের এ ধরনের লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলাকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের এ সংঘাত ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি’ বয়ে আনবে। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান উত্তেজনা সবার জন্যই বিপজ্জনক। এটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’ রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে চলা আলোচনাকে একটি ‘ছদ্মবেশী অভিযান’ (কভার অপারেশন) হিসেবে ব্যবহার করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এ সংঘাত কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। যুক্তরাজ্য বলেছে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায় এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সেই বিষয়ে মার্কিন প্রচেষ্টাকে তাঁর দেশ সমর্থন করে।