পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে চরম উত্তেজনা, বিমান হামলায় যুদ্ধবিরতি ভাঙনের ঝুঁকি
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাকিস্তান আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি শহরে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে, যা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার সরাসরি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের পটভূমি ও কারণ
পাকিস্তানে গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের হামলার পর সীমান্ত পেরিয়ে এই পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বান্নুতে একটি নিরাপত্তা সামরিক বহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন। এর আগে গত সপ্তাহে আরেক আত্মঘাতী হামলায় ১১ সেনাসদস্য ও এক শিশু প্রাণ হারায়। ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের একটি মসজিদে জোহরের নামাজের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে অন্তত ৩১ জন মুসল্লি নিহত ও ১৭০ জন আহত হন।
পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা বারবার আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষকে তাদের মাটি ব্যবহার করে পরিচালিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দমনের আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু কাবুল 'কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে' ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামাবাদের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুল্লাহ খান মনে করেন, কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতাও পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনা নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে।
নতুন 'প্রতিরোধ কাঠামো' ও হামলার বৃদ্ধি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিদায়ের পর থেকে পাকিস্তানে হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ইসলামাবাদভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের তথ্যমতে, কেবল ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেই পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ২ হাজার ৪ শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন, যা গত এক দশকে দেশটির জন্য সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছরের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর টিটিপির ক্রমবর্ধমান হামলাগুলোই সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের মূল কারণ। ইসলামাবাদ এখন নতুন এক 'প্রতিরোধ কাঠামো' তৈরির চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে তারা এই বার্তা দিতে চায় যে আফগানিস্তান থেকে কোনো হামলা চালানো হলে কাবুলকে তার চরম মূল্য দিতে হবে।
ভারতের ভূমিকা ও আফগান শরণার্থী ইস্যু
গত অক্টোবরে সীমান্ত সংঘর্ষ চলাকালে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি প্রথমবারের মতো ভারত সফর করেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের কাবুলভিত্তিক বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস মনে করেন, ভারতে মুত্তাকিকে উচ্চপর্যায়ে অভ্যর্থনা জানানো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড় ধরনের হামলা চালানোর সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
এ ছাড়া দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়েছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে বহিষ্কারের ঘটনায়। কয়েক দশকের যুদ্ধ ও সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ৩০ লাখ আফগান নাগরিক পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন, যা বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাড়তি বিরোধের সৃষ্টি করেছে।
পরিস্থিতির সম্ভাব্য দিক ও ভবিষ্যৎ
টিটিপির উপস্থিতি পাকিস্তানের জন্য প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ালেও বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ বড় কোনো যুদ্ধের রূপ নেওয়ার আশঙ্কা কম। পাকিস্তানের তুলনায় আফগানিস্তানের প্রথাগত সামরিক শক্তি অনেক কম এবং দুই পক্ষই উত্তেজনা প্রশমনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে এই সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা শিগগিরই থামছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাকিস্তান স্পষ্ট সংকেত দিয়েছে যে আফগানিস্তান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসে যারা তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে, সেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা অভিযান অব্যাহত রাখবে। গত বছরের অক্টোবরে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
