ইরানে হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনামের তিক্ত অভিজ্ঞতা ফিরে আসতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র দেশ ভিয়েতনাম। বর্তমানে সুসম্পর্ক থাকলেও এই নামের সঙ্গে মধু নেই, আছে তিক্ততা। কারণ, পাঁচ দশক আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের নাকানিচুবানি খাইয়েছিল দেশটি। অজেয় বলে পরিচিত মার্কিন বাহিনীর সেই পরাজয়ের লজ্জা ও আতঙ্ক বহুদিন ধরে কুরে কুরে খেয়েছে আমেরিকানরা। অর্ধশতাব্দি পর যুক্তরাষ্ট্র আবার সেই ‘ফাঁদে পড়তে’ যাচ্ছে বলে খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেনারেল ও সহকারীরাও আশঙ্কা করছেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যর্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিলেন মার্কিন সেনারা। ১৯৬০-এর দশকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও অন্য কমিউনিস্ট মিত্রদেশগুলো উত্তর ভিয়েতনামকে সমর্থন করে, আর যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড এবং অন্য কমিউনিস্টবিরোধী মিত্রদেশগুলো দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন দেয়। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ হাজারের বেশি সৈন্য নিহত হয় এবং প্রায় ১৬৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় হয়।
এই বিপুল ব্যয়ের কারণে তৎকালীন মার্কিন সরকারের নেওয়া 'গ্রেট সোসাইটি' তথা দারিদ্র্য ও বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক অধিকার উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া একগুচ্ছ উচ্চাভিলাষী সামাজিক সংস্কার কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া দেশটিতে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি। যুদ্ধে ব্যর্থতা মার্কিন সামরিক বাহিনীর অপরাজেয়তার মিথ ভেঙে দেয় এবং দেশের ভেতরে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। এই পরাজয় দেশটির জনগণের মধ্যেও দীর্ঘস্থায়ী ভীতি তৈরি করে, যার কারণে তারা পরবর্তী বহু বছর বিদেশের মাটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
ইরানে হামলার প্রস্তুতি ও মিত্রদের সমর্থনহীনতা
ইহুদিবাদী ইসরাইল ২০২৫ সালের জুনে ইরান আক্রমণ করেছিল। তাদের উসকানিতে ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রও। ইরানের কয়েকটি পরমাণু কেন্দ্রে বাঙ্কার বাস্টার বোমা মেরে সেগুলো ধ্বংস করতে সেই হামলা চালায়। তবে পাল্টা হামলা চালিয়ে ইরান যে সাহস ও সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে তা ভাবিয়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের। ইসরাইল নাছোড়বান্দা, কোনো অবস্থাতেই ইরানকে অক্ষত ছাড়তে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন যে, ইরান ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল যুদ্ধ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও বেশ কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার আরব সাগরে মোতায়েন করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। এছাড়া ইরানকে ঘিরে আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত দুই ডজন সামরিক ঘাঁটিতে অর্ধলক্ষাধিক মার্কিন সেনা মোতায়েন করা আছে। অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সাবমেরিনসহ উপসাগরীয় এলাকায় বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ মিসাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও আছে যুক্তরাষ্ট্রের।
কিন্তু ইরান আক্রমণের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে আরব ও ইউরোপীয় মিত্রদের বরাবরই টেবিলের চারপাশে পায় ওয়াশিংটন। কিন্তু ইরান আক্রমণের বেলায় পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। এমনকি আশপাশের যত দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে তারা সবাই আগেভাগে তাদের আকাশ ও ভূমি ব্যবহার করতে দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। কথিত শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের কারণে সৌদি, আমিরাত, কাতার, বাহরাই ও ইরাকের মতো আরব দেশগুলো ইরান আক্রমণে সহযোগিতা করবে না—এটা কয়েক বছর আগেও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। কিন্তু এবার তা ঘটেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে খোদ যুক্তরাজ্যও।
সম্ভাব্য হামলার পরিণতি ও ঝুঁকি
ট্রাম্প যদি তার সহকারী ও শীর্ষ জেনারেলদের পরামর্শ উপেক্ষা করে শুধু ইসরাইলের ‘ফাঁদে পা দিয়ে’ সত্যিই ইরানে আক্রমণ করেন, তাহলে একটি দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও বার বার সতর্ক করেছেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভূমিতে যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। পাল্টা আক্রমণ হবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব স্থাপনায়।
যুক্তরাষ্ট্র যেমন তেহরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তেমনি নিজেদের গুছিয়ে রেখেছে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র যোদ্ধা গোষ্ঠী হুথি, ইরাকের প্যারামিলিটারি বাহিনী হাশদ-আল শাবি ও লেবাননের হিজবুল্লাহ। ইরাকের হাশদ-আল শাবিরই শুধু ৬০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে। এরা সবাই এক যোগে মার্কিন রণতরী ও ইসরাইলে হামলা করবে, যা ফেরানো ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালী বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। এর ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে ইরান। দেশটি বরাবরই হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে তারা এই পানিপথ বন্ধ করে দেবে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের প্রধান তেল করিডোর। এই পথে পৃথিবীতে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-চতুর্থাংশেরও পরিবহণ করা হয়। আবার গ্যাস সরবরাহেরও মূল পথ। বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেয় তুরস্ক। এরই অংশ হিসেবে গত জানুয়ারির শেষ দিকে বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। এরপর ওমানে প্রথম দফায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা এবং পরে জেনেভায় দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। একই সঙ্গে হুমকি অব্যাহত রাখলেও ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিচ্ছেন না। এমনকি ট্রাম্পের সহকারীরাও তাকে ইরান আক্রমণের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি কমানো ও মার্কিন অর্থনীতির দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং দেশটির শীর্ষ জেনারেলরাও সম্ভাব্য হামলাটি বিপজ্জনক হতে পারে বলে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এখন ইরানের পরিবর্তে ট্রাম্পের ভোটারদের মনজয় করার কাজে বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার বলে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তা ও সহকারীরা মনে করেন। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ইরানে হামলা করে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না ট্রাম্প। এরপরও শুধু ইসরাইলের চাপে যুক্তরাষ্ট্রকে যদি হামলার পথ বেছে নিতেই হয়, তাহলে তা গত বছরের জুনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। সীমিত পরিসরে একটি বোঝাপড়ার হামলা হতে পারে, যা তেল আবিবকে সন্তুষ্ট করবে।
ওয়াশিংটনের ওপর ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে ইসরাইল নিজেও আগ বাড়িয়ে ইরানে হামলা করতে পারে। আগামী অক্টোবরে ইসরাইলে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা আছে। আসন্ন ভোটযুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রকট। এমতাবস্থায় একটি যুদ্ধ বাধিয়ে ইরানকে কাবু করে নিজ নাগরিকদের কাছে নায়ক বনে যেতে চান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। এ কারণে ইসরাইলকে ২৫ ফেব্রুয়ারি নতুন করে আরও ৫০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
