যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে ইরান। জেনেভায় অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার একটি বড় বিতর্কের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের এই সামরিক সক্ষমতাকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কী?
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হলো রকেটচালিত অস্ত্র, যা উৎক্ষেপণের প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত থাকে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ পথই মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে নির্দিষ্ট গতিপথে অগ্রসর হয়। এগুলো প্রচলিত বিস্ফোরক বা সম্ভাব্যভাবে জৈব, রাসায়নিক কিংবা পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম এবং বিভিন্ন দূরত্বে আঘাত হানতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন ও পাল্লা
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ সবচেয়ে বড়। ইরান স্বঘোষিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সীমিত রেখেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, এই পাল্লা দেশের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট, কারণ এর মাধ্যমে ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব।
ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তেহরান এবং এর আশপাশে অবস্থিত। কেরমানশাহ, সেমনান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কাছে অন্তত পাঁচটি ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে।
ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সেজিল – ২,০০০ কিমি
- এমাদ – ১,৭০০ কিমি
- গদর – ২,০০০ কিমি
- শাহাব-৩ – ১,৩০০ কিমি
- খোররামশাহর – ২,০০০ কিমি
- হোভেইজেহ – ১,৩৫০ কিমি
২০২৫ সালের এপ্রিলে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা আইএসএনএ একটি গ্রাফিক প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, ইসরাইলে পৌঁছাতে সক্ষম এমন নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের রয়েছে। এর মধ্যে সেজিলের গতি ঘণ্টায় ১৭,০০০ কিলোমিটারের বেশি এবং পাল্লা ২,৫০০ কিমি।
সর্বশেষ কবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে?
২০২৫ সালের জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে তেহরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যাতে বহু মানুষ নিহত হয় এবং ভবন ধ্বংস হয়। দ্য ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার এবং AEI ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট জানায়, সংঘাতে ইসরাইল সম্ভবত ইরানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করে।
ইসরাইলের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেওয়ার পর ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। আগাম সতর্কতা দেওয়ায় কেউ হতাহত হয়নি। কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
কৌশল ও উন্নয়ন
ইরান বলছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও আঞ্চলিক অন্যান্য সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা জোগায়। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক বেহনাম বেন তালেব্লু উল্লেখ করেন, ইরান ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র গুদাম, পরিবহন ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, উৎপাদন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে।
২০২৩ সালের জুনে ইরান তাদের প্রথম দেশীয়ভাবে তৈরি হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে বলে সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির অন্তত পাঁচ গুণ দ্রুতগতিতে জটিল গতিপথে উড়তে পারে, ফলে এগুলো প্রতিরোধ করা কঠিন।
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মূলত উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার নকশার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং চীনের সহায়তাও পেয়েছে। এছাড়া ইরানের কাছে খ-৫৫-এর মতো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য এবং প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা রাখতে সক্ষম।
