ইরানের 'শাহেদ' ড্রোন থেকে কৌশলগত পরিবর্তন: মধ্যপ্রাচ্যে অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের আশঙ্কা
ইরানের কৌশল পরিবর্তন: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা

ইরানের সামরিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন: মধ্যপ্রাচ্যে অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের আশঙ্কা

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত ইরানি ‘শাহেদ’ ড্রোনের গুঞ্জন যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পশ্চিমা দেশগুলো একে কেবল একটি ‘উপদ্রব’ হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু সেই সাধারণ ড্রোনই আজ ইরানের সমরকৌশলের এক শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন ইরানের এই পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে মারাত্মক ভুল করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি এ খবর জানিয়েছে।

২০২৫ সালের পর উত্তেজনার নতুন মাত্রা

২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর বর্তমান পরিস্থিতি আবারও সেই উত্তেজনার চরমে পৌঁছেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে আসার জন্য মাত্র কয়েক দিনের সময় বেঁধে দিচ্ছেন, অন্যদিকে তেহরান প্রস্ততি নিচ্ছে ‘কারবালা’র আদর্শে চরম প্রতিরোধের। পাশ্চাত্যের ধারণা ছিল সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতিস্বীকার করানো যাবে। কিন্তু ইরানের কৌশল এখন আর কেবল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

শাহেদ ড্রোনের মতো সস্তা কিন্তু কার্যকর অস্ত্র দিয়ে তারা ইসরায়েলের বহুমুখী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি কৌশলগত ভাষায় কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক চাপ হলো একটি কূটনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার। কিন্তু ইরানের কাছে এটি তাদের আদর্শিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

খামেনির কৌশলগত ভাষা পরিবর্তন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সম্প্রতি ‘কৌশলগত সংযম’ থেকে সরে এসে ‘কারবালার লড়াই’-এর ভাষা ব্যবহার শুরু করেছেন। শিয়া রাজনৈতিক চেতনায় এর অর্থ হলো, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেওয়া। ওয়াশিংটন যখন একটি ‘সীমিত হামলার’ মাধ্যমে ইরানকে দমানোর পরিকল্পনা করছে, ইরান তখন একে দেখছে তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে।

যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ইরানপন্থি হিজবুল্লাহ বা ইরাকি মিলিশিয়াদের দুর্বল করে দেওয়ায় ঝুঁকি কমেছে। কিন্তু সমরবিদদের মতে, দুর্বল হয়ে পড়া পক্ষ যখন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ইরানের ওপর হামলা হলে হিজবুল্লাহ, হুথি বা কাতাইয়িব হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলো কেবল তেহরানকে রক্ষার জন্য নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে।

খামেনি-পরবর্তী ইরানের সম্ভাব্য দৃশ্যকল্প

পশ্চিমা অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, খামেনি-পরবর্তী ইরান হয়তো নরম হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। তেহরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস ইতোমধ্যে এমন এক উত্তরাধিকার পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে, যা যুদ্ধের মানসিকতায় আরও কঠোর ও অনমনীয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সীমিত হামলা বরং ইরানের কট্টরপন্থিদের আরও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

বিখ্যাত সমরবিদ ক্লজউইৎস বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে সব কিছুই খুব সহজ, কিন্তু সহজ বিষয়গুলোই করা সবচেয়ে কঠিন।’ ওয়াশিংটনের মানচিত্রে যা একটি ‘নিয়ন্ত্রিত হামলা’ মনে হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় তা একটি অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। ইরানের সামরিক কৌশলের এই আমূল পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।