পাকিস্তানের বিমান হামলাকে 'অমার্জনীয় অপরাধ' বলল তালেবান, সামরিক জবাবের হুমকি
পাকিস্তানের হামলাকে 'অমার্জনীয় অপরাধ' বলল তালেবান

পাকিস্তানের বিমান হামলাকে 'অমার্জনীয় অপরাধ' বলল তালেবান, সামরিক জবাবের হুমকি

আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তালেবান সরকার। এই হামলাকে তারা 'অমার্জনীয় অপরাধ' হিসেবে অভিহিত করেছে এবং এর জবাব সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে। তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ আল আরাবিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই ঘোষণা দেন।

গোপনীয় প্রতিশোধ পরিকল্পনা

মুজাহিদ স্পষ্ট করে বলেন, পাকিস্তানের অন্যায় পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পদ্ধতি আপাতত 'গোপনীয়' রাখা হয়েছে। তবে আফগান প্রতিরক্ষা বাহিনী উপযুক্ত সময়ে এর জবাব দেবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখন সরাসরি যুদ্ধের রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ইসলামি দেশগুলোর প্রতি আহ্বান

জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বিশ্বের ইসলামি দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা পাকিস্তানের এই আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ এবং তাদের মধ্যে অনেক অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। তাই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলোর উচিত পাকিস্তানকে তাদের বর্তমান নীতি পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া।

টিটিপি বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য

মুজাহিদ আরও স্পষ্ট করেন যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে আফগানিস্তানের কোনো যোগসূত্র নেই। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য আফগান ভূমিকে লক্ষ্যবস্তু করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপি-এর উপস্থিতির বিষয়ে ইসলামাবাদের অভিযোগ কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছেন মুজাহিদ।

তিনি দাবি করেছেন, টিটিপি পাকিস্তানের ভেতরেই বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আফগান ভূখণ্ডের কোনো প্রয়োজন নেই। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে করা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন প্রচারণা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রতিটি হামলার দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপানো পাকিস্তানের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তানের 'প্রকাশ্য যুদ্ধ' ঘোষণা

অন্যদিকে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে 'প্রকাশ্য যুদ্ধ' ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন যে, দীর্ঘদিনের কূটনীতি ও ধৈর্য ধরার পর এখন পাকিস্তানের 'ধৈর্যের বাঁধ' ভেঙে গেছে।

আফগান বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের ওপর হামলা চালানোর পর পাকিস্তানের এই কঠোর অবস্থান বলে বিবিসি-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাজা আসিফের মতে, পাকিস্তান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও আফগান ভূখণ্ড থেকে টিটিপি-এর হামলা বন্ধ না হওয়ায় তারা এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথে হাঁটছে।

সীমান্তে চরম অস্থিতিশীলতা

দেশ দুটির মধ্যে এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এর আগে অক্টোবর মাসে দুই দেশ একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও দফায় দফায় সংঘর্ষে তা কার্যকর হয়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং আফগান সংবাদমাধ্যম টোলো নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই বিমান হামলায় আফগানিস্তানের বেশ কিছু বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা

এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ না থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সামরিক বিশ্লেষক হাদি কুরেশিও এই মত সমর্থন করে বলেছেন যে, টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।