ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় ট্রাম্পের কৌশল: ইরাক যুদ্ধের ভুলের পুনরাবৃত্তি?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় ট্রাম্পের কৌশল: ইরাকের ভুল?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় ট্রাম্পের কৌশল: ইরাক যুদ্ধের ভুলের পুনরাবৃত্তি?

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার মধ্যে বৃহস্পতিবার গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ থেকে ভূমধ্যসাগরের পথে মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের চলাচল নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে। ইরাক যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যা দেশটির প্রতিষ্ঠিত নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন পরিস্থিতি না হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না।

পরিহাসের বিষয়: ট্রাম্পের কৌশলগত ভুল

এখন এই বিষয়টি একটি পরিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ট্রাম্প এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন এবং কৌশলগত ভুল করতে পারেন, যা ২০০৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বুশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি ছিল ইরাকের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি পরিকল্পনায় অবহেলা, যার ফলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে কি না, তার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেননি ট্রাম্প। তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বিপুল সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন অভিযানের পর এটিই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

কূটনৈতিক চাপ ও সম্মানহানির ঝুঁকি

বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু হওয়া আলোচনায় তেহরানকে কিছুটা পিছু হটতে চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে এই সেনা সমাবেশ। তবে শেষ পর্যন্ত যদি কূটনৈতিকভাবে বড় কোনো সাফল্য না আসে, আর গুলি চালানো বাদেই এই সেনা সমাবেশ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিতে হয়, তাহলে তা ট্রাম্পের জন্য সম্মানহানিকর হতে পারে। ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের ভিত্তি হলো ‘মাগা’ বা ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলুন’ শীর্ষক আন্দোলন, যা বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা রয়েছে: ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন মার্কিন বাহিনী হয়তো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে দেশের মানুষ এর জন্য প্রস্তুত নন। ইরাকে হামলা শুরুর আগে বুশ কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, যা ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ছিল। ইরানে হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পও অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর যুক্তি দেখাচ্ছেন, যদিও মঙ্গলবার রাতে স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে নিজের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করেছেন তিনি।

ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বাড়িয়ে বলা ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে ইরানকে কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে দেওয়া হবে না, কিন্তু তিনি আগেই দাবি করেছেন যে গত বছর হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে শত শত মার্কিন সেনার মৃত্যুর জন্য ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দায়ী বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। ইরাক হামলার দিনগুলোর প্রতিধ্বনি সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে, যখন ট্রাম্প ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলাপ শুরু করেন।

তিনি বলেন, তারা এরই মধ্যে এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে, যেগুলো ইউরোপকে এবং বিদেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ট্রাম্প হয়তো ইরানের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে বলছেন, তবে হুমকিটা যখন তিনি নিজের দেশের ওপর টেনে আনছেন, তখন তিনি সেই বিতর্কিত পথই বেছে নিচ্ছেন, যা ইরাক যুদ্ধের বৈধতা দেওয়ার জন্য বুশের প্রশাসন ব্যবহার করেছিল।

ইরানের শাসনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বুশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি ছিল ইরাকের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি পরিকল্পনায় অবহেলা। ইরাকের চেয়ে ইরান শক্তিশালী দেশ, কিন্তু মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কারণে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কী হতে পারে, তা নিয়ে ট্রাম্প এখনো মার্কিনদের খোলাখুলি কিছু বলেননি। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানে শাসন পরিবর্তনের ফলে কী হবে, তার আভাস দিতে পারছেন না যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ক্ষমতার এ শূন্যতা পূরণে সবচেয়ে সম্ভাব্য শক্তি হতে পারে বিপ্লবী গার্ড কোর, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি শক্তির জায়গায় একই ধরনের আরেকটি শক্তি আসতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভিন দেশে শাসক পরিবর্তন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেমন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা, কিন্তু ইরানে সরকার পতন হলে দেলসির মতো যুক্তরাষ্ট্র কাউকে খুঁজে পাবে—এমন সম্ভাবনা অনেক কম বলে মনে হচ্ছে।

অহংকার ও ভুল ধারণার ঝুঁকি

প্রতিপক্ষ কীভাবে আচরণ করবে, তা নিয়ে ভুল ধারণার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনও একই ধরনের ভুল–বোঝাবুঝির মধ্যে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ২০০৩ সালের মতোই এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঝুঁকি হলো অহংকার। ইরাকের ক্ষেত্রে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, কম সময়েই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে এবং দেশটিতে মার্কিন সেনাদের মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানানো হবে।

২০ বছরের বেশি সময় পর ট্রাম্পও মনে করছেন, ইরানে সহজ জয় পাবে মার্কিন বাহিনী। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য কূটনীতি এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বৃহস্পতিবার জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তবে এই আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে ট্রাম্পকে ইরান কোনো ছাড় দিতে রাজি হয় কি না, তার ওপর।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে সমঝোতা কঠিন হতে পারে। ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে: তিনি এমন কোনো চুক্তি মেনে নিতে পারবেন না, যা সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলের পারমাণবিক চুক্তির মতো দেখায়। এ কারণে ইরানে সামরিক পদক্ষেপ ট্রাম্পের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, যদিও এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনই সঠিক সময় হতে পারে, কারণ ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ইরানের ভেতরেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারে, তাহলে দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন ট্রাম্প এবং চীনের প্রভাববলয় থেকে একটি দেশকে বের করেও আনতে পারবেন। তাই চলতি শতকের শুরুর দিকে ইরাকে মার্কিন সামরিক বিপর্যয়ের মতো সতর্কবার্তা থাকলেও ট্রাম্প হয়তো সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইবেন।