সমুদ্রে মার্কিন রণতরীর ভয়াবহ সংকট: ৫ হাজার নাবিকের মানসিক বিপর্যয়
মার্কিন রণতরীর সংকটে ৫ হাজার নাবিক বিপর্যস্ত

সমুদ্রে মার্কিন রণতরীর ভয়াবহ সংকট: ৫ হাজার নাবিকের মানসিক বিপর্যয়

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার নাবিক বর্তমানে টয়লেট ব্যবস্থা বিকল থেকে শুরু করে মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন জাহাজ মোতায়েনের সময়সীমা দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানোর পর এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

দীর্ঘ মোতায়েনের প্রভাব

গত বছরের জুন মাস থেকে টানা সমুদ্রে অবস্থান করছে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড। সাধারণত শান্তিকালে একটি বিমানবাহী রণতরীর মোতায়েনকাল থাকে ৬ মাস, কিন্তু এই জাহাজের নাবিকরা ইতোমধ্যে ৮ মাস সমুদ্রে কাটিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমেরির বরাতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই সময়সীমা ১১ মাস পর্যন্ত বাড়তে পারে। যদি তা হয়, তাহলে এটি হবে মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে কোনো জাহাজের টানা মোতায়েনের নতুন রেকর্ড।

জাহাজের প্রযুক্তিগত সমস্যা

টানা ৮ মাস সমুদ্রে থাকার ফলে জাহাজের যন্ত্রপাতিতে মারাত্মক চাপ পড়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন পিছিয়ে যাওয়ায় নানা ত্রুটি দেখা দিয়েছে। জানুয়ারিতে এনপিআর-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে, ১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই রণতরীর টয়লেটগুলোর অনেকগুলোই অচল হয়ে পড়েছে। নাবিকরা দিনরাত কাজ করে লিকেজ মেরামত করছেন।

ভ্যাকুয়াম-ভিত্তিক পদ্ধতির কারণে একটি টয়লেটে সমস্যা হলে ওই অংশের সব টয়লেটই অকেজো হয়ে যায়। পাইপলাইনে টি-শার্ট থেকে শুরু করে চার ফুট লম্বা দড়ির টুকরো পর্যন্ত আটকে থাকতে দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হচ্ছে টয়লেটের পেছনের একটি অংশ ঢিলা হয়ে যাওয়া, যা পুরো স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।

নাবিকদের ব্যক্তিগত ও মানসিক সংকট

জাহাজে থাকা এক নাবিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে অনেকেই ক্ষুব্ধ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের অনেকে দায়িত্ব শেষ হলেই নৌবাহিনী ছাড়তে চান। জাহাজের অধিকাংশ নাবিকই বিশের কোঠার তরুণ-তরুণী। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং ‘ঘোস্ট মোডে’ থাকার কারণে তারা স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও করতে পারছেন না।

‘ঘোস্ট মোডে’ থাকার অর্থ হলো অবস্থান গোপন রাখার জন্য যোগাযোগ সীমিত রাখা। এই পরিস্থিতিতে নাবিকরা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, যা তাদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। অনেক নাবিক আন্তর্জাতিক সুযোগ পেলেই চাকরি ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানা গেছে।

মিশন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফোর্ড। সেই মিশনের পর নাবিকরা জানতে পারেন, ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তাদের মোতায়েন আরও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে আরেকটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে যোগ দেবে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, নয়টি ডেস্ট্রয়ার এবং তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ অন্তর্ভুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে একই সময়ে দুইটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি খুবই বিরল ঘটনা বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে জাহাজের প্রযুক্তিগত সমস্যা, অন্যদিকে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কীভাবে এই সংকট মোকাবেলা করবে, তা এখন সবার নজরে।