ট্রাম্পের শান্তি দাবি: আট সংঘাতে হস্তক্ষেপের দাবি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান কতটা?
ট্রাম্পের শান্তি দাবি: আট সংঘাতে হস্তক্ষেপ, স্থায়ী সমাধান নেই

ট্রাম্পের শান্তি দাবি: আট সংঘাতে হস্তক্ষেপের দাবি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান কতটা?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি আন্তর্জাতিক সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন এবং এই প্রচেষ্টার জন্য তার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত। তবে বাস্তবতা হলো, যেসব ইস্যু থেকে এসব সংঘাতের জন্ম, তার অনেকগুলোই এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এমনকি কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও সহিংসতা দেখা দিয়েছে, যা ট্রাম্পের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান: ঘোষণাপত্র কিন্তু চুক্তি নয়

গত বছরের ৮ আগস্ট ট্রাম্প আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের নেতাদের একত্র করে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করান, যেখানে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করা হয়। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক থেকে দুই দেশ এই বিরোধে জড়িয়ে আছে। ২০২৩ সালে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও মার্চে খসড়া শান্তিচুক্তির পাঠে একমত হওয়ার পরও সেটি স্বাক্ষরিত হয়নি। হোয়াইট হাউসের মধ্যস্থতায় হওয়া এই ঘোষণাপত্রটি একটি পূর্ণাঙ্গ, আইনগত বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন শান্তিচুক্তি নয়। আর্মেনিয়ার সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড: যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ছে বারবার

দীর্ঘদিনের উত্তেজনা জুলাই মাসে পাঁচ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। ট্রাম্প দুদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সংঘাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত রাখেন। অক্টোবরে মালয়েশিয়ায় এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে পড়ে। পরে ২৭ ডিসেম্বর নতুন করে যুদ্ধবিরতি হয়। তবুও উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি এবং অঞ্চলটিতে অস্থিরতা চলমান রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল পরিস্থিতি

গাজায় সংঘাত থামাতে ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাস একটি ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি বিনিময় চুক্তিতে সম্মত হয়। তবুও উভয় পক্ষ একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে এবং সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা চলছিল, কিন্তু ১৩ জুন ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে এবং ২২ জুন ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলায় যোগ দেন। পরে কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়, তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা আবার বেড়েছে।

আফ্রিকা ও এশিয়ায় অমীমাংসিত সংঘাত

রুয়ান্ডা-সমর্থিত এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠী পূর্ব কঙ্গোতে বড় অংশ দখল করে। ট্রাম্পের চাপে ২৭ জুন রুয়ান্ডা ও কঙ্গো একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। কঙ্গো অভিযোগ করেছে, রুয়ান্ডা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরাও রুয়ান্ডার বিরুদ্ধে এম২৩-কে সমর্থনের অভিযোগ তুলেছেন। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে মে মাসে উত্তেজনা চরমে ওঠে এবং চার দিনের সংঘাতের পর ১০ মে যুদ্ধবিরতি হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়ে তিনি চুক্তি নিশ্চিত করেছেন, যদিও ভারত এ দাবি অস্বীকার করেছে।

ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের চ্যালেঞ্জ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারে বলেছিলেন, তিনি এক দিনের মধ্যে এই যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন। তবে প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে এখনো সমাধান আসেনি। তিনি রাশিয়ার বড় দুটি তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, কিন্তু আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প কিম জং উনের সঙ্গে আবার বৈঠকের আগ্রহ দেখিয়েছেন, কিন্তু পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে অগ্রগতি হয়নি।

সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের চুক্তি করান এবং দাবি করেন তিনি যুদ্ধ ঠেকিয়েছেন, তবে দুই দেশের মধ্যে এখনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নেই। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়নি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সংঘাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক শান্তিচুক্তি এখনো হয়নি এবং অনেক অঞ্চলে সংঘাতের ঝুঁকি রয়ে গেছে। ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য কূটনৈতিক ধৈর্য ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।