মার্কিন হুমকির মুখে ইরান: চীন-রাশিয়ার সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরানের সংকটে চীন-রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা

মার্কিন হুমকির মুখে ইরান: চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কয়েক দশক ধরে টিকে থাকার লড়াইয়ে ইরান বর্তমানে সবচেয়ে বড় মার্কিন হুমকির সম্মুখীন। এই সংকটময় সময়ে দীর্ঘদিনের মিত্র চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সহায়তার আশা করলেও তেহরান বাস্তবে এক ভিন্ন চিত্র দেখছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শক্তিশালী এই দুই বন্ধু রাষ্ট্র সরাসরি কোনও সংঘাতে জড়াতে অনীহা প্রকাশ করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই খবর জানিয়েছে, যা ইরানের জন্য নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

প্রতীকী নৌ মহড়া ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

গত এক সপ্তাহে ওমান উপসাগরে রাশিয়া ও ইরান একটি ক্ষুদ্র পরিসরে নৌ মহড়া চালিয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে চীন, রাশিয়া ও ইরানের একটি যৌথ মহড়া হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বিপুল মার্কিন সমরশক্তির তুলনায় এই মহড়াকে নেহাতই প্রতীকী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা উল্লেখ করেন যে, গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর থেকেই বেইজিং ও মস্কোর সহায়তায় নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তেহরান।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত ইরানে হামলার নির্দেশ দেন, তবে চীন বা রাশিয়া সরাসরি সামরিক সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, "তারা ইরানি শাসনের জন্য নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দেবে না। তারা চায় না বর্তমান শাসনের পতন হোক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো চিন্তাই তাদের নেই।"

চীন ও রাশিয়ার স্বার্থ ও সীমাবদ্ধতা

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন। আগামী মার্চ মাসে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। বেইজিং ইরানের তেলের বড় ক্রেতা এবং দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবের সরাসরি বিরোধিতা করে ট্রাম্পকে চটাতে চায় না তারা। অন্যদিকে রাশিয়ার কাছে তেহরানের চেয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ইউক্রেন ইস্যু সমাধান করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প বেরিয়ে যাওয়ার পর খামেনি ‘পশ্চিম নয়, পূর্বের দিকে তাকাও’ নীতি গ্রহণ করলেও তার ফল তেহরানের জন্য খুব একটা সুখকর হয়নি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিশেষজ্ঞ আলী ওয়ায়েজ বলেন, "ইরানিরা রুশ ও চীনাদের ওপর ক্ষুব্ধ। তারা চায় এই দুই রাষ্ট্র আরও ভূমিকা রাখুক। কিন্তু বেইজিং ও মস্কোর কাছে এর চেয়ে ভালো কোনও বিকল্প নেই দেখে তেহরান তাদের ওপরই নির্ভর করে আছে।"

মার্কিন প্রস্তুতি ও ইরানের কৌশল

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, গত জুনের ‘মিডনাইট হ্যামার’ অভিযানের মতো কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে এককালীন হামলা নয়, ট্রাম্প এবার কয়েক সপ্তাহব্যাপী টানা বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর বিপরীতে মস্কো বা বেইজিংয়ের অবস্থান খুবই নড়বড়ে। ওমান উপসাগরের মহড়া শেষ হতে না হতেই রাশিয়ার একমাত্র হেলিকপ্টার ক্যারিয়ারটি গত বৃহস্পতিবারই ওই এলাকা ত্যাগ করেছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক রায়ান হাস ও অ্যালি ম্যাথিয়াস বলেন, মার্কিন হামলায় যদি ইরানি শাসনের পতন ঘটে, তবে বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য হবে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করা, যাতে ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ না হয়ে ওঠে। বর্তমানে ইরান তার সামরিক পেশি প্রদর্শনের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারা বার্তা দিতে চাইছে যে, মিত্রদের সাহায্য ছাড়াই তারা বিশ্ব তেল বাণিজ্য ব্যাহত করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে সক্ষম।

গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌ-ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই পরিবহন করা হয়। চীন ও রাশিয়া ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রযুক্তি সরবরাহ করলেও তা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আলী ওয়ায়েজের মতে, সংঘাত শুরু হলে সব সাহায্যই সীমিত হয়ে পড়বে। যুদ্ধের ময়দানে চীন বা রাশিয়া কেবল সমবেদনা আর প্রার্থনাই পাঠাবে, এর বেশি কিছু নয়।