ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পূর্তিতে ইইউ নেতাদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পেরিয়ে আজ বুধবার পাঁচ বছরে গড়াল। এই উপলক্ষে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানাতে গতকাল কিয়েভে ইইউ নেতাদের একটি যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো দেশই তাদের অবস্থান থেকে পিছিয়ে যেতে চায় না, এবং মস্কো ও কিয়েভ উভয়ই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে।
ক্রেমলিনের লক্ষ্য ও জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া
ইউক্রেনে হামলা শুরুর চতুর্থ বার্ষিকীতে ক্রেমলিন গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, রাশিয়া এখনো তাদের যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চালিয়ে যাবে। এএফপির এক প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘লক্ষ্যগুলো এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, যে কারণে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, ইউক্রেনকে দখল করে নেওয়ার যে লক্ষ্য ভ্লাদিমির পুতিন নির্ধারণ করেছিলেন, তা অর্জনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। জেলেনস্কি অনড় অবস্থান নিয়ে বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি স্থাপনের জন্য গত চার বছরের যুদ্ধে জনগণের ত্যাগ ও আত্মদানের সঙ্গে ইউক্রেন বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। তবে তাঁর প্রধান মিত্রদের মধ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে বিভেদ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় সমর্থন ও হাঙ্গেরির ভেটো
ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন দফার নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের জন্য ৯০ বিলিয়ন ইউরোর একটি ঋণ প্যাকেজে একমত হওয়ার আশা করছিল। কিন্তু মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা হাঙ্গেরি গত সোমবার উভয় প্রস্তাবে ভেটো বহাল রেখেছে। হাঙ্গেরি ও প্রতিবেশী স্লোভাকিয়া অভিযোগ করেছে, কিয়েভ উদ্দেশ্যমূলকভাবে পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ তেল সরবরাহ বন্ধ করে রেখেছে। তবে ইউক্রেনের দাবি, গত মাসে রাশিয়ার হামলার পর সেটি তারা মেরামতের চেষ্টা করছে।
কিয়েভে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি ও জেলেনস্কির বক্তব্য
কিয়েভে গতকাল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেনসহ ইউরোপের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আসার কথা ছিল। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার বড় কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রপ্রধান কিয়েভে আসেননি। তবে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
অনুষ্ঠানে জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিন তাঁর লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। তিনি ইউক্রেনের জনগণকে ভাঙতে পারেননি। তিনি এই যুদ্ধে জয়ী হননি।’ এ সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কিয়েভ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতে উভয় পক্ষের লাখ লাখ সেনা হতাহত হয়েছেন। মারা গেছেন অনেক বেসামরিক মানুষ। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের অনেক শহর ধ্বংস হয়েছে। রাশিয়াও পাল্টা ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা ভূখণ্ডগত প্রশ্নে স্থবির হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এসে এ যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করবেন। কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা এখনো কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়া মস্কোর দাবি, ইউক্রেনকে পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলের পুরোপুরি ছাড়তে হবে। এখন সেখানে ২০ শতাংশ কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে কিয়েভের ভাষ্য, যে ভূমি রক্ষায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে, সেই ভূমি তারা ছাড়বে না।
বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া
- ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইউক্রেনে সামান্য কিছু ভূখণ্ড দখলের জন্য রাশিয়াকে বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে। একদিন রুশরা বুঝতে পারবে, তাদের নামে কত বড় অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে একটি ত্রিমুখী ব্যর্থতা।
- পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি বলেছেন, ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। যারা প্রতিদিন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, আমরা তাদের সাহসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’
- ন্যাটোপ্রধান মার্ক রুতে বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্রদের অবশ্যই সামরিক, আর্থিক ও মানবিক সহায়তা আরও বাড়াতে হবে।
