ইরানের অনড় অবস্থান: পারমাণবিক কর্মসূচি ছাড়বে না তেহরান, মার্কিন হুমকি উপেক্ষা
পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরি ও যুদ্ধবিমানের সারি মোতায়েনের পরও যেকোনও মুহূর্তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি এবং চরম উত্তেজনার মধ্যেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ও অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে নতিস্বীকার করতে সম্পূর্ণভাবে অনড় রয়েছে। তেহরানের এই দৃঢ় অবস্থান মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে বিস্ময় ও বিরক্তি সৃষ্টি করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আদর্শিক ভিত্তি রক্ষায় যুদ্ধের ঝুঁকি গ্রহণ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে তাদের আদর্শগত ভিত্তি এবং সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়ার অর্থ হলো নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করা। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়ে যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়াকেই তারা বেঁচে থাকার জন্য কম বিপজ্জনক পন্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মনোভাব ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের সমীকরণকে প্রতিফলিত করে।
জেনেভায় বৈঠক: সংঘাত এড়ানোর শেষ চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুদ্ধ এড়ানোর একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বেসামরিক উদ্দেশ্যে সীমিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রস্তাবটি গভীরভাবে বিবেচনা করা হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে যেকোনওভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত রাখতে চাইছে, পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কমানো এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধের দাবিও জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে।
ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি: আত্মরক্ষার অধিকার
তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য এবং ক্ষেপণাস্ত্র আত্মরক্ষার মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচ্য। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং ইরান সরকারের সাবেক কৌশলগত বিষয়ক উপ-সহকারী প্রধান সসান করিমি বলেন, “যুদ্ধ এড়িয়ে চলা অবশ্যই উচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়, তবে তা যেকোনও মূল্যে নয়। একটি আদর্শিক রাষ্ট্র কখনও কখনও বর্তমান অস্তিত্বের চেয়ে ইতিহাসে নিজের স্থানকে বেশি গুরুত্ব দেয়।”
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরান
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় পৌঁছেছে, এবং গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। গত সপ্তাহান্তেও ছোট আকারে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নির্দেশ করে। মার্কিন প্রশাসন ধারণা করছে যে ইরান এখন এতটাই দুর্বল যে তারা সব দাবি মেনে নেবে, কিন্তু ট্রাম্পের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের এই ‘অপ্রত্যাশিত’ অনড় মনোভাবে প্রকাশ্য বিরক্তি দেখিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা: নতিস্বীকারের পরিণতি
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ওয়ায়েজ স্পষ্ট করে বলেন, “ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেওয়া মানে হলো যমদূতের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া। তারা বিশ্বাস করে, একবার নতিস্বীকার করলে চাপ কমবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্র তাদের টুঁটি চেপে ধরতে আরও উৎসাহিত হবে।” ২০২৪ সালে এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও একই সুরে বলেছিলেন যে আমেরিকার আসল সমস্যা হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব নিয়ে, পারমাণবিক শক্তি বা মানবাধিকার নয়।
সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি ও কৌশলগত দিক
যদি সংঘাত শুরু হয়, তবে তা কতদূর গড়াবে তা নিয়ে নানা সমীকরণ বিদ্যমান। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমি মনে করেন, ইরান সম্ভবত গত জুনের মতোই সীমিত হামলা হজম করে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করবে। কিন্তু ট্রাম্প যদি আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোয়, তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে শুরুতেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। অন্যদিকে, ইরান ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কৌশল অনুসরণ করতে পারে, যেমন ২০২৩ সালে হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজ ও রণতরিতে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটনকে শতকোটি ডলারের লোকসানে ফেলেছিল। ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক ডলার বেড়ে যেতে পারে, যা চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। আলী ওয়ায়েজ সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধ করলেই যে ইরান নমনীয় হবে বা কূটনীতি সহজ হবে, এটা ভাবা আসলে এক ধরনের বিভ্রম।”
