রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: চার বছর পর এক নজরে
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চার বছর পূর্ণ করে পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। এই দীর্ঘ সংঘাত ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার সমাপ্তি এখনো অনিশ্চিত।
হতাহতের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
এই যুদ্ধে সামরিক জনবলের হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছেছে বলে অনুমান করা হয়। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রুশ পক্ষের প্রায় ১২ লাখ সেনা হতাহতের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, পুরো যুদ্ধে ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন, যদিও সিএসআইএসের অনুমান সর্বোচ্চ ৬ লাখ ইউক্রেনীয় সেনা হতাহতের শিকার হতে পারেন।
বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতিও উদ্বেগজনক: জাতিসংঘের হিসাবে, চার বছরে ১৫ হাজার ১৬৮ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪১ হাজার ৫৩৪ জন আহত হয়েছেন।
ভূখণ্ড দখল ও যুদ্ধের অগ্রগতি
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) এর তথ্যমতে, রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভূখণ্ড (১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার) দখলে রেখেছে, যার মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপও অন্তর্ভুক্ত। ২০২৫ সালে রাশিয়া প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার নতুন এলাকা দখল করেছে বলে জানা গেছে, যদিও মস্কোর দাবি এই সংখ্যা আরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি বিপুল প্রাণহানির বিনিময়ে এসেছে এবং গত তিন বছরে যুদ্ধ অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে। উভয় পক্ষই বড় অগ্রগতি অর্জন বা পুনরুদ্ধারে হিমশিম খেয়েছে, ফলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।
শান্তি আলোচনার বর্তমান অবস্থা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল, কিন্তু ভূখণ্ড-সংক্রান্ত ইস্যুতে অগ্রগতি না হওয়ায় আলোচনা জটিল রয়ে গেছে।
ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আলোচনায় সামরিক বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও ভূখণ্ড নিয়ে মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি স্পষ্ট করেছেন যে তাঁর দেশ পরাজয় মানবে না, এবং তিনি পুতিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন।
রাশিয়ার শর্ত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শান্তি-শর্তগুলো যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই অপরিবর্তিত রয়েছে:
- নিরপেক্ষ ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ইউক্রেন, যা কোনো সামরিক জোটের সদস্য হবে না।
- ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ।
- নাৎসিবাদমুক্ত ইউক্রেন।
এছাড়া, ক্রিমিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ মস্কোর কাছে আপসযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞ নিকোলাই পেট্রোর মতে, রাশিয়া পূর্ণ বিজয় চায়, এবং এর কম কিছু অর্জিত হলে পশ্চিমা বিশ্ব তা পরাজয় হিসেবে প্রচার করতে পারে।
এই যুদ্ধের সমাপ্তি কবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত, তবে হতাহত ও ভূখণ্ড দখলের লড়াই চলমান থাকায় শান্তি প্রক্রিয়া জটিল থেকে যাচ্ছে।
