মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের দ্বিমুখী নীতি: শান্তি বোর্ড গঠনের পাশাপাশি ইরানকে হুমকি
ট্রাম্পের দ্বিমুখী নীতি: শান্তি বোর্ড ও ইরান হুমকি

মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের দ্বিমুখী অবস্থান: শান্তি বোর্ড গঠন ও ইরান হুমকি

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজস্ব 'বোর্ড অব পিস' গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সময়ে তিনি ইরানকে যুদ্ধের চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যা তার পররাষ্ট্রনীতির এক বড় বৈপরীত্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্য জোটের এক সভায় ট্রাম্পের দেওয়া এই সর্বশেষ আলটিমেটাম আঞ্চলিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা দিয়েছে।

শান্তির আহ্বান ও সামরিক হুমকির মিশ্রণ

ট্রাম্প বরাবরই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বলে আসছেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে নতুন চুক্তির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানের জন্য এখন একটি চুক্তিতে আসা হবে 'বুদ্ধিমানের কাজ'। কিন্তু এই আলোচনার পরিবেশের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে সমর্থকদের ধারণার চেয়েও বেশি সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপগুলো কংগ্রেসের পূর্ব অনুমতি ছাড়াই ঘটছে বলে জানা গেছে।

ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের রেকর্ড

ট্রাম্পের এই হুমকিকে কেবল আলোচনার কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সামরিক পদক্ষেপ নিতে তিনি দ্বিধা করেন না। তবে ইরানের ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য ততটা স্পষ্ট নয়। গত বছরের জুনে মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো 'বিধ্বস্ত' হয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করলেও, এখন আবার কেন হামলার প্রয়োজন বা নতুন লক্ষ্যবস্তু কী, তার কোনও ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি ইরানে শাসন পরিবর্তন চান, নাকি আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে চান, তা নিয়ে রহস্য দানা বাঁধছে। আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার প্রথম 'স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন' ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তাকে ব্যাখ্যা করতে হবে যে এই সম্ভাব্য যুদ্ধ তার 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির সঙ্গে কীভাবে খাপ খায়।

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার পার্থক্য

২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন একের পর এক সামরিক অভিযান - সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইরান - তার কট্টর সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন অভিবাসন ও অর্থনীতি নিয়ে ভোটাররা এমনিতেই ক্ষুব্ধ অবস্থায় রয়েছেন।

আরেকটি বড় বৈপরীত্য হলো ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা। তিনি দাবি করেছেন, আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তিনি এই পুরস্কারের যোগ্য। অথচ একদিকে শান্তির জন্য প্রচার চালানো এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার এই নজিরবিহীন ঘটনা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।

ইসরায়েলের ভূমিকা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য হামলায় গত বছরের মতো এবারও ইসরায়েল সরাসরি অংশগ্রহণ করবে। তবে গাজা পুনর্গঠন বা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতায় এই যুদ্ধের প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনও পাওয়া যায়নি।

পুরো বিশ্ব যখন ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অন্ধকারে রয়েছে, তখন ট্রাম্প সম্ভবত এই অনিশ্চয়তাকেই উপভোগ করছেন। বৃহস্পতিবার তিনি রহস্য রেখে বলেছেন, 'আমাদের একটি অর্থবহ চুক্তি করতে হবে, অন্যথায় খারাপ কিছু ঘটবে। বিশ্বকে এখন অপেক্ষা করে দেখতে হবে আমরা কী করি।'

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী অবস্থান ওয়াশিংটন ও তেহরানকে এক ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে শান্তির আহ্বান, অন্যদিকে সামরিক অভিযানের হুমকি - এই দ্বিমুখী নীতি মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।