রবি নদীর পানি প্রবাহ বন্ধে ভারতের বাঁধ প্রকল্প, পাকিস্তানে পানিসংকটের আশঙ্কা
রবি নদীর পানি বন্ধে ভারতের বাঁধ, পাকিস্তানে সংকট

রবি নদীর পানি প্রবাহ বন্ধে ভারতের বাঁধ প্রকল্প, পাকিস্তানে পানিসংকটের আশঙ্কা

রবি নদীর উদ্বৃত্ত পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হওয়া বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে ভারত। এর ফলে গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পাকিস্তানের পানিসংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ রানার বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার পরিপ্রেক্ষিতে শাহপুর কান্দি বাঁধের কাজ ত্বরান্বিত হয়েছে এবং প্রকল্পটি এখন সমাপ্তির পথে।

বাঁধ প্রকল্পের বিবরণ ও সময়সীমা

বাঁধটি চালু হলে রবি নদীর অতিরিক্ত পানি পাকিস্তানে যাওয়া বন্ধ করতে সক্ষম হবে ভারত। রানা আরও উল্লেখ করেন, শাহপুর কান্দি বাঁধের কাজ ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পানি খরাপ্রবণ কাঠুয়া ও সাম্বা জেলায় সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'পাকিস্তানে যাওয়া উদ্বৃত্ত পানি বন্ধ করা হবে। এটি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কাঠুয়া ও সাম্বা জেলা খরাকবলিত এলাকা এবং এই প্রকল্পটি আমাদের অগ্রাধিকার।'

প্রকল্পের ঐতিহাসিক পটভূমি

শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্প বর্তমানে রবি নদীর উদ্বৃত্ত পানি মাধোপুর হয়ে ভাটির দেশ পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়। এই বাঁধের মাধ্যমে সেই পানি পাঞ্জাব এবং জম্মু ও কাশ্মীরে সরিয়ে নেওয়া হবে। পাকিস্তানে রবির পানি প্রবাহিত হওয়া বন্ধ করতে প্রায় পাঁচ দশক আগে ১৯৭৯ সালে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তবে পাঞ্জাব ও জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের কারণে নির্মাণকাজ থমকে গিয়েছিল। ২০০৮ সালে এটিকে একটি জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

অর্থনৈতিক ও কৃষি প্রভাব

৩ হাজার ৩৯৪ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের ৮০ শতাংশ (২ হাজার ৬৯৪ কোটি ২ লক্ষ টাকা) দিচ্ছে পাঞ্জাব সরকার এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ (৭০০ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা) দিচ্ছে ভারত সরকার। বাঁধটি ৫৫ দশমিক ৫ মিটার উঁচু এবং এতে ৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি হাইডেল চ্যানেল রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রকল্পটি পাঞ্জাবের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর এবং জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া ও সাম্বা জেলা জুড়ে ৩২ হাজার ১৭৩ হেক্টরের বেশি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করবে।

সিন্ধু পানি চুক্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

সাবেক সেচ মন্ত্রী তাজ মহিউদ্দিন বলেন, সিন্ধু পানি চুক্তি এই বাঁধের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে না, কারণ রবি নদীর ওপর ভারতের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে। সিন্ধু পানি চুক্তি ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগামে পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের হাতে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পরদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করে। ১৯৬০ সালের পর এই প্রথম ভারত স্পষ্টভাবে পানি সহযোগিতার বিষয়টিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সন্ত্রাসবাদ ব্যবহারের সাথে যুক্ত করল।

'অপারেশন সিঁদুর' এর পাশাপাশি নেওয়া এই পদক্ষেপটি পাকিস্তানের প্রতি ভারতের নীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় অর্থাৎ শত্রুতার মাঝে সহযোগিতা চলতে পারে না। পাকিস্তানের কৃষিখাতের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ সিন্ধু নদ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কারণ ইসলামাবাদের পানি সঞ্চয় ক্ষমতা বড়জোর এক মাসের প্রবাহ মেটাতে পারে।

ভবিষ্যৎ প্রকল্প ও সম্ভাব্য ফলাফল

চুক্তিটি যখন কার্যকর ছিল তখন সিন্ধু, ঝিলাম এবং চেনাব নদীর ওপর পাকিস্তানের অধিকার ছিল। আর রবি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর ওপর অধিকার ছিল ভারতের। চুক্তিটি এখন স্থগিত থাকায় কেন্দ্র সরকার সিন্ধু অববাহিকায় সাওয়ালকোট, রাতলে, বুরসার, পাকাল দুল, কাওয়ার, কিরু এবং কিরথাই ১ ও ২-এর মতো বেশ কিছু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারত সাওয়ালকোট প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই পদক্ষেপের ফলে পাকিস্তানে পানিসংকট তীব্র হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে। ভারতের এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং ভবিষ্যতে পানিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।