রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা শুরু, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে কিয়েভের চাপ
রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে জেনেভায় শান্তি আলোচনা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক টেবিলে বসেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। তবে এই শান্তি আলোচনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কিয়েভকে দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর নিশ্চিত করেছে।

আলোচনার কেন্দ্রে ভূখণ্ড নির্ধারণের প্রশ্ন

আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণের চার বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এর ঠিক আগমুহূর্তে শুরু হওয়া এই দুই দিনের আলোচনায় মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে ভূখণ্ড বা সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ বসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি কঠোর সুরে বলেন, ইউক্রেনের উচিত দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসা। তিনি আরও যোগ করেন, আমি আপনাদের এটুকুই বলছি।

ট্রাম্পের অনড় অবস্থানে কিয়েভের উভয়সংকট

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের কারণে কিয়েভ এখন উভয়সংকটে পড়েছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ওয়াশিংটন তাকে ছাড় দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে। চলতি বছর আবুধাবিতে দুই দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এবারের জেনেভা বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে ক্রেমলিন। রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে।

ক্রেমলিনের দাবি, ডনেস্ক অঞ্চলের যে ২০ শতাংশ এলাকা তারা এখনও দখল করতে পারেনি, কিয়েভকে তা ছেড়ে দিতে হবে। তবে কিয়েভ এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, এবার ভূখণ্ডসহ আমাদের উত্থাপিত সব দাবি নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা হবে। অন্যদিকে জেলেনস্কি পাল্টা দাবি করে বলেছেন, আলোচনার আগের রাতেও রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রেখেছে। পর্যাপ্ত চাপ এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি ছাড়া এই যুদ্ধ থামবে না।

রুদ্ধদ্বার আলোচনা ও প্রতিনিধি দলের বিবরণ

ক্রেমলিন জানিয়েছে, এবারের আলোচনা হবে সম্পূর্ণ রুদ্ধদ্বার এবং সংবাদমাধ্যমের কোনও প্রবেশাধিকার থাকবে না। রাশিয়ার ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা ভ্লাদিমির মেদিনস্কি। তবে আগের বৈঠকগুলোতে মেদিনস্কির বিতর্কিত আচরণের কারণে এবারও বড় কোনও অগ্রগতির বিষয়ে সংশয় রয়েছে। রুশ দলে সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ইগর কস্তিউকভও থাকছেন।

অন্যদিকে ইউক্রেনের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব রুস্তম উমেরভ এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ কিরিলো বুদানোভ। উমেরভ বলেন, একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জনই আমাদের অপরিবর্তিত লক্ষ্য।

ট্রাম্প প্রশাসনের উপস্থিতি ও অন্যান্য ইস্যু

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে এই বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। তারা একই সময়ে জেনেভায় ইরানের সঙ্গে চলা বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন। শুধু ভূখণ্ড নয়, জাপোরিজ্জিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ পরবর্তী ইউক্রেনে পশ্চিমা সেনাদের ভূমিকা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

মস্কোভিত্তিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভ্লাদিমির সোত্নিকভ বলেন, রাশিয়ার সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধে ক্লান্ত, তাই এবার হয়তো রাশিয়া কিছুটা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করবে। তবে ইউক্রেনের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখনও অনিশ্চিত। এই আলোচনা ইউরোপীয় শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে, কিন্তু এর ফলাফল এখনও অনুমানের ওপর নির্ভর করছে।